মোহাম্মদ রবিউল হোসেন: লেখক ও সাংবাদিক। একসময় পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলো ছিল অত্যন্ত আন্তরিক, সহযোগিতাপূর্ণ এবং ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। মানুষের অর্থ-সম্পদ হয়তো কম ছিল, কিন্তু হৃদয়ে ছিল উদারতা, মায়া-মমতা ও একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ। সুখে-দুঃখে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়াতেন। সময়ের পরিবর্তনে মানুষের অর্থ-সম্পদ বেড়েছে, বড় বড় বাড়ি হয়েছে, জমি-জায়গা ও ব্যবসা-বাণিজ্য হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মানুষের সম্পদ যত বেড়েছে, অনেক ক্ষেত্রে আন্তরিকতা ও ভালোবাসা ততই কমেছে। মানুষের মন সংকীর্ণ হয়েছে, বেড়েছে অহংকার, হিংসা, স্বার্থপরতা ও বিভেদ। আগে একটি সমাজের সবাই মিলে মিলাদুন্নবী উদযাপন করতেন। এখন সেই একটি সমাজই দশ ভাগে বিভক্ত হয়ে আলাদা আলাদা আয়োজন করছে। আগে একই সমাজের মানুষ একটি মসজিদে নামাজ আদায় করতেন, একসঙ্গে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন। এখন সমাজ ভেঙে আলাদা আলাদা মসজিদ, আলাদা আলাদা বলয় তৈরি হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের এই বিভক্তি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? একসময় একটি পরিবারে দুই, চার কিংবা পাঁচ ভাই একসঙ্গে বসবাস করতেন। সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করতেন। এখন সেই পরিবারই সম্পত্তির ভাগাভাগি, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও মতের অমিলের কারণে দশ ভাগে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। আত্মীয়তার সম্পর্কেও তৈরি হচ্ছে দূরত্ব। একজন আত্মীয়ের পাশে দাঁড়ালে অন্য আত্মীয় অসন্তুষ্ট হচ্ছেন। ভালো কাজের মূল্যায়নের পরিবর্তে কে কাকে কতটা খুশি করতে পারল, কে কাকে কতটা তোষামোদ করতে পারল, সেটিই যেন বড় হয়ে উঠেছে। বর্তমান সমাজে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের সততা, যোগ্যতা কিংবা মানবিকতার চেয়ে অর্থ-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তির মূল্য বেশি। যার টাকা আছে, যে মানুষকে খাওয়াতে পারে কিংবা আর্থিক সুবিধা দিতে পারে, তার কদর বেশি। অথচ একজন সৎ মানুষ সত্য কথা বললে তার মূল্যায়ন হয় না। মিথ্যা, তোষামোদ ও স্বার্থের সম্পর্ক যেন সমাজে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, মানুষের মানবিকতাও যেন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় একজন মানুষ আহত হয়ে পড়ে থাকলেও অনেকে তাকে সাহায্য করার পরিবর্তে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করতে ব্যস্ত থাকেন। অথচ একসময় বিপদে পড়া একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল সামাজিক দায়িত্ব ও মানবিকতার পরিচয়। আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই সমাজে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কী শিখছে? অর্থ-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যই কি জীবনের সবকিছু? মানুষ হিসেবে আমাদের পরিচয় কোথায়? ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, আত্মীয়তা, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতি যদি হারিয়ে যায়, তাহলে এত সম্পদ দিয়ে কী হবে? মনে রাখতে হবে, আজ আপনার অর্থ আছে, ক্ষমতা আছে, প্রভাব-প্রতিপত্তি আছে বলে আপনি সম্মান পাচ্ছেন; কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। কখন কার কাছে সাহায্যের জন্য যেতে হবে, কখন কার সহযোগিতা প্রয়োজন হবে, তা একমাত্র মহান আল্লাহই জানেন। তাই অহংকার নয়, মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করুন। অর্থ দিয়ে নয়, ভালোবাসা ও মানবিকতা দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিন। আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখুন, সমাজের বিভেদ দূর করুন এবং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ান।কারণ দিনশেষে বাড়ি, গাড়ি, জমি কিংবা অর্থ-সম্পদ নয়, মানুষের ভালোবাসা, সম্মান ও সুন্দর সম্পর্কই জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আসুন, বিভক্তির সমাজ নয়, ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও মানবিকতার সমাজ গড়ে তুলি।
বিজ্ঞাপন
বান্দরবন জেলা পরিষদ