মোহাম্মদ আরমান মিয়া সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট "স্বাধীন বাংলা নিউজ" :

পলিথিন ও প্লাস্টিকের বিষবলয়ে বাংলাদেশ: আমাদের অজান্তেই কি ঘরে ঢুকছে ‘নীরব ঘাতক:

সকালবেলা বাজারের ব্যাগ হাতে বের হওয়া থেকে শুরু করে রাতের ডাইনিং টেবিল—সবখানেই এখন রাজত্ব করছে প্লাস্টিক আর পলিথিন। চাল, ডাল, সবজি কেনায় ব্যবহৃত ক্ষতিকর পলিথিন ব্যাগ যেমন পরিবেশ ধ্বংস করছে, তেমনি রান্নাঘরের ভোজ্যতেলের বোতল, মশলার কৌটা, কোমল পানীয়র ক্যান, এমনকি শিশুদের খাবারের পাত্র ও খেলনাও এখন প্লাস্টিক নির্ভর। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এই ‘প্লাস্টিক সংস্কৃতি’ কেবল পরিবেশ নয়, সরাসরি মানবদেহে প্রবেশ করাচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক, যা নিয়ে প্রশাসনের চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাজারে পলিথিনের জয়জয়কার

২০০২ সালে বাংলাদেশে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হলেও বর্তমানে ছোট-বড় প্রতিটি বাজারে এর ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। ক্রেতা ও বিক্রেতারা কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই পলিথিন ব্যবহার করছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বড় কোনো অভিযান বা কঠোর নজরদারি না থাকায় পলিথিনের এই ব্যবহার এখন দিন দিন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ফলে শহরের ড্রেন ও জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি করছে এবং মাটির উর্বরতা হারিয়ে যাচ্ছে।

রান্নাঘর থেকে শিশুর হাতে প্লাস্টিকের বিষ

অনুসন্ধানে দেখা যায়, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সিংহভাগ পণ্যই এখন প্লাস্টিকে মোড়ানো। বাজারে প্রচলিত প্রায় সব ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল বা সরিষার তেল প্লাস্টিকের বোতলে বিক্রি হচ্ছে। মশলাপাতি, এমনকি শিশুদের জন্য গুঁড়ো দুধ বা সিরিয়াল (বেবি ফুড) আসছে প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ে। শুধু তাই নয়, শিশুদের খেলনাগুলোও তৈরি হচ্ছে নিম্নমানের প্লাস্টিক দিয়ে।

চিকিৎসকদের মতে, প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার বা পানীয় দীর্ঘ সময় থাকলে তাতে 'মাইক্রোপ্লাস্টিক' এবং 'বিসফেনল-এ' (BPA) এর মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশে যায়। যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরে ক্যানসার, হরমোনজনিত সমস্যা এবং প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসের মতো ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে। @

প্রশাসনের ‘অসহায়ত্ব’ না কি অবহেলা?

পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, পলিথিন ও প্লাস্টিক বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের কঠোরতা দরকার ছিল, তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে নামকাওয়াস্তে অভিযান চালানো হলেও মূল উৎপাদনকারী কারখানাগুলো রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এছাড়া পলিথিনের বিকল্প হিসেবে সাশ্রয়ী পাটের ব্যাগ বা কাগজের ঠোঙার উৎপাদন ও বিপণনেও সরকারি কোনো কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ:

পরিবেশবিদরা বলছেন, প্লাস্টিক একটি অপচনশীল দ্রব্য যা শত বছরেও মাটিতে মিশবে না। আমরা যদি এখনই সচেতন না হই এবং সরকার যদি প্লাস্টিক আমদানিতে ও উৎপাদনে কঠোর না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ একটি ‘প্লাস্টিক বর্জ্যের ভাগাড়ে’ পরিণত হবে।

  সতর্কবার্তা: "আপনার আজকের একটি পলিথিন ব্যাগ বা প্লাস্টিক বোতল আপনার সন্তানের আগামীকালের অভিশাপ হতে পারে। পলিথিনকে 'না' বলুন, প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা দাবি করুন এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যে ফিরে আসুন।"