জমি নিবন্ধন সেবাখাতকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে সরকার বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ গ্রহনের পরও এ খাতে প্রযুক্তিতে নতুন আশার আলো যেনো কোনোভাবেই বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যার কারনে জমি নিবন্ধন সেক্টরে দুর্নীতি কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।  তৃণমূল থেকে উচ্চমহল পর্যন্ত যেন ঘুষের হাট। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি বলছে, সেবা খাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিতে হয় বিচারিক সেবায়।

‎বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব আদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত রেজিস্ট্রেশন বিভাগ। এনবিআরের পরেই এর অবস্থান। ৫ই আগস্ট বিপ্লবের পর বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরে যেখানে সংস্কার চলছে বড় চ্যালেঞ্জিং নিয়ে। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসেও সংস্কারের নামে ঘুষবাণিজ্যে এখনো লিপ্ত কিছু অসাধু কর্মকর্তা। এর মধ্যে অন্যতম নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ সাব রেজিস্ট্রার মো: রিয়াজুল ইসলাম। তিনি পূর্বে কক্সবাজার সদর উপজেলার দায়িত্বে কর্মরত ছিলেন পাশাপাশি বাংলাদেশ রেজিষ্ট্রেশন সার্ভিস এসোসিয়েশন কার্যনির্বাহী পরিষদ (২০২৫-২৬) নির্বাচিত কমিটির কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দলিল সম্পাদন, টাকার বিনিময়ে জমির শ্রেণি পরিবর্তন, ফয়সাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণ, ক্রেতা-বিক্রেতাদের হয়রানি, প্রতি দলিলে ১%, না দিলে কাজ তো হবেই না, উল্টো দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে। অবশেষে বাধ্য হয়ে সেবাগ্রাহকদের ঘুষ দিয়েই ফিরতে হবে। অভিযোগগুলোও দীর্ঘদিনের।

‎মূলত নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলা গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্প এলাকা, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য হারে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমি নিবন্ধনও এখানে হয়ে থাকে। অতিরিক্ত নিবন্ধন ফি ও নতুন বিধিনিষেধ আরোপের কারণে এখানে জমির দলিল নিবন্ধনের হার প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। এতে মোটা অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। ব্যক্তিগত কিংবা বিশেষ প্রয়োজনেও জমি বিক্রি করতে না পারায় ভোগান্তি বেড়েছে সাধারণ জমির মালিকদের।

‎সোনারগাঁ সাব-রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা যায়, জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আগে যেখানে উৎস কর ছিল ৪ শতাংশ, সেখানে এটা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৮ শতাংশ। পৌরসভার ক্ষেত্রে পৌর কর ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে নিবন্ধনের বাড়তি টাকার চাপে পড়ে অনেকেই জমি কেনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। তবুও এর মধ্যেও ভেন্ডার সমিতির নেতাদের সখ্যতায় নিজেদের মতো ঘুষরেট সাজিয়ে দলিল রেজিস্ট্রির বাইরেও বেশিরভাগই হেবা দলিলের নামে দলিল প্রতি কন্ট্রাকে রেজিস্ট্রি করে যাচ্ছে কর্মকর্তা ও অফিস সিন্ডিকেট মিলে, দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে দলিল প্রতি অফিস খরচের নামে ০.৫% থেকে শুরু করে ১% পর্যন্ত অধিক হারে সাধারণ সেবাগ্রাহকদের হয়রানি করে সেরেস্তা খরচ নামে একত্রতা রেখে এসকল কর্মকান্ডে পূর্বের মতো বর্তমানেও সক্রিয় অসাধু সিন্ডিকেট৷ আর তার সাথেই তাল মেলাচ্ছেন সাব রেজিস্ট্রার মো: রিয়াজুল ইসলাম। 

‎সরকার প্রতিটি সাব রেজিস্ট্রার অফিসে কর্মকর্তা সহ ৪ জন কর্মচারী মিলে মোট ৫ জন স্থায়ীভাবে দায়িত্বরত থাকে। এর বাইরেও অফিসের আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত নকল নবিশদের খরচ চালানোসহ অফিস ভাড়া ইত্যাদি পরিচালনা করতে তারা সমিতির নেতাদের সাথে সখ্যতা রেখে দলিল প্রতি যেই বাড়তি অর্থ আদায় করে থাকে সেখান থেকে একটি খাত সাব রেজিস্ট্রার কর্মকর্তার ফান্ডে, অপর ফান্ডটি অফিস পরিচালনাসহ প্রশাসন-গনমাধ্যম-রাজনৈতিক ট্যাগেল দেওয়া এবং সর্বশেষ ফান্ডটি যোগ হয় সমিতির নামে। উমেদার, অফিস সহকারী, নকল নবিশ থেকে শুরু করে অসাধু দলিল লেখকরা ঘুষ ছাড়া আবেদনই গ্রহণ করেন না। ঘুষ যে শুধু দলিল সম্পাদনেই নেওয়া হয়, তাও নয়।  (নকল) কপিসহ অন্যান্য কাগজপত্র তুলতে গেলেও মোহরানা দিতে হয় সেবাগ্রহীতাদের। সরকার নির্ধারিত ফি’র বাইরে সমিতির নাম ভাঙিয়ে প্রতি নকলের কপিতে ১ হাজার থেকে আড়াই হাজার পর্যন্ত অতিরিক্ত টাকা নেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একইভাবে অন্যান্য সেবাখাতেও দিতে হয় কমিশন, আছে সেবা অনুযায়ী নির্ধারিত অংক! অদৃশ্য এই অনৈতিক অর্থ আদায়ের তালিকা পরিণত হয়েছে নিজস্ব নিয়মে।

‎সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের অফিস সহকারী আমজাদ, মোহরারগন ও দলিল লেখক ভেন্ডার সমিতি নেতাদের সখ্যতায় শক্তিশালী সিন্ডিকেটে গড়ে উঠেছে।

‎পূর্বের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের মধ্যে বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার আলী আজগর, সর্বশেষ কর্মরত বর্তমানে জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার মুজিবুর রহমান। পূর্বে যারা এই দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন সকলের আস্থাভাজন সহকারী ছিলেন আমজাদ। পরবর্তী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হবে এখানকার কারসাজির স্ব-চিত্র।