মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন মাইলফলক অর্জন করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। আমাদের সৌরজগতের বাইরে অবস্থিত একটি দূরবর্তী গ্রহ থেকে এবারই প্রথম সরাসরি রেডিও সংকেত শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ‘বিটা পিক্টোরিস বি’ নামের একটি বিশাল গ্যাসীয় গ্রহ থেকে এই তরঙ্গগুলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে। তবে এই সংকেতের সঙ্গে ভিনগ্রহের কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্বের কোনো যোগসূত্র নেই। বরং এই রেডিও তরঙ্গ ওই গ্রহটির অস্বাভাবিক শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের অস্তিত্ব স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে।

পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই গ্রহটির ভর আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতির প্রায় ১২ গুণ। এটি একটি তরুণ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, যার ভর সূর্যের ভরের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৭৫ গুণ বেশি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যাডো বার্গারের নেতৃত্বে গবেষক দলটি দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বাধুনিক ‘মিরক্যাট’ রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে এই সংকেত খুঁজে পান। প্রায় ৬৪টি রেডিও ডিশের সমন্বয়ে গঠিত এই শক্তিশালী টেলিস্কোপটি বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে সংকেতটি নিখুঁতভাবে রেকর্ড করেছে।

বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গ্রহটির নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্রের কারণে তৈরি হওয়া শক্তিশালী মেরুজ্যোতি বা অরোরাই এই তরঙ্গের মূল উৎস। পৃথিবীর মেরুজ্যোতির ঘটনার মতোই উচ্চশক্তির বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত কণাগুলো চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ঘটিয়ে এই ধরনের তীব্র বিকিরণ তৈরি করে থাকে। গবেষক অ্যাডো বার্গার জানান, আমাদের সৌরজগতের বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্র সবচেয়ে শক্তিশালী হলেও ‘বিটা পিক্টোরিস বি’-এর চৌম্বক ক্ষেত্র তার চেয়ে অন্তত ২০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। এর প্রভাবে সৃষ্ট বিশাল ম্যাগনেটোস্ফিয়ার নক্ষত্রটির দিকে প্রায় ৩০ লাখ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।

এর আগে বহির্গ্রহ থেকে রেডিও বিকিরণ আসার সম্ভাবনা নিয়ে নানা গবেষণা হলেও সেগুলোর সুনির্দিষ্ট উৎস নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জোসেফ কলিংহামের মতে, অতীতের সংকেতগুলো গ্রহ থেকে নাকি তার কেন্দ্রস্থ নক্ষত্র থেকে আসছে, তা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে এই প্রথম গবেষণায় সংকেতের উৎস সরাসরি গ্রহটির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ বছর বয়সী এই নক্ষত্রমণ্ডলটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিচারে অত্যন্ত নবীন এবং এখানে গ্রহ গঠনের বিভিন্ন উপাদান ও ধূলিকণা এখনো রয়ে গেছে।

তবে এই গবেষণার ফলাফল এখনো চূড়ান্ত পিয়ার রিভিউ বা বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষ করেনি। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংকেতটি নিয়ে আরও বিস্তারিত যাচাই-বাছাই প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা। এই আবিষ্কার শেষ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত হলে তা বহির্গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র এবং বায়ুমণ্ডলের গোপন রহস্য উন্মোচনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। একই সঙ্গে মহাকাশের এত তরুণ একটি গ্রহে কীভাবে এত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হলো, সেটির পেছনের কারণও পরিষ্কার হবে।