ডিজাইন: ইমেজ চালু
বৃহস্পতিবার ১১ জুন ২০২৬

দৈনিক সময়কাল

নিজে সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়েও টিটু হোসেন ফরিদগঞ্জের 'সেরা স্বেচ্ছাসেবী'


মোঃ ইয়াছিন পালোয়ান:

মানুষের জীবনে কিছু কিছু গল্প থাকে, যা কেবল একটি মানুষের গল্প নয়; বরং একটি সমাজের আশা, বিশ্বাস ও মানবতার প্রতিচ্ছবি। ফরিদগঞ্জের টিটু হোসেন তেমনই একজন মানুষ, যার জীবন সংগ্রাম, ত্যাগ ও মানবসেবার গল্প আজ অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা ও মানবতার পাঠ

ফরিদগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের রামদাসের বাগ গ্রামের সন্তান টিটু। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছেন। বাবার স্নেহ-ভালোবাসা আর নিরাপদ আশ্রয়ের অনুভূতি খুব অল্প বয়সেই তার জীবন থেকে হারিয়ে যায়। এরপর মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ ও সীমাহীন মমতার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন তিনি।

জীবনের শুরু থেকেই অভাব-অনটনকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন টিটু। Hunger (ক্ষুধা) ও দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করা এই যুবক বিলাসিতা নয়, সংগ্রামকেই নিত্যসঙ্গী করেছেন। নিজের যাপিত জীবনের এই কঠিন অভিজ্ঞতাই তাকে শিখিয়েছে অন্যের দুঃখকে নিজের দুঃখ হিসেবে অনুভব করতে।

স্বীকৃতির মোহহীন এক সেবক

নিজের স্বাভাবিক বোধ-বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই টিটু নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন মানুষের সেবায়। যখন সমসাময়িক অন্যরা নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়ার স্বপ্নে বিভোর, তখন টিটু ছুটেছেন অসহায় মানুষের পাশে। কোনো স্বীকৃতির আশায় নয়, কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশায় নয়—শুধু মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এক অদম্য বাসনা নিয়ে।

৫ হাজার ব্যাগ রক্তের জোগানদাতা ও আস্থার প্রতীক

আজ তিনি ফরিদগঞ্জের মানুষের কাছে একজন 'নির্ভরতার নাম'। পেয়েছেন ফরিদগঞ্জের শ্রেষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবীর তকমা। এই পরিচয়ের পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর নিরলস পরিশ্রম ও হাজারো মানবিক উদ্যোগ।

তার উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ:

  • রক্তের ব্যবস্থা: এখন পর্যন্ত তিনি প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি মানুষের জন্য মুমূর্ষু অবস্থায় রক্তের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। হাসপাতালের করিডোরে রক্তের জন্য হাহাকার করা স্বজনদের কাছে প্রথম ভরসার নাম টিটু।

  • কন্যাদায়গ্রস্তদের পাশে: অভাবের কারণে যেসব বাবা মেয়ের বিয়ে দিতে পারছেন না, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন টিটু।

  • চিকিৎসা সহায়তা: অর্থাভাবে চিকিৎসা বন্ধ হওয়া মানুষের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে দিয়েছেন।

  • দুর্যোগের সারথী: সামাজিক দুর্যোগ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিংবা করোনা মহামারির মতো ভয়াবহ সময়ে টিটু ছিলেন সম্মুখসারীর একজন যোদ্ধা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন খাদ্য ও সাহসের বার্তা।

বিশ্বাসই যার মূলধন

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, টিটু নিজে কোনো ধনী পরিবারের সন্তান নন। এতসব মানবিক কাজও তিনি নিজের অর্থায়নে করেন না। কিন্তু তিনি অর্জন করেছেন মানুষের অমূল্য 'বিশ্বাস'। ফরিদগঞ্জের অনেক বিত্তবান মানুষ টিটুর সততা, নিষ্ঠা ও মানবিকতার ওপর গভীর আস্থা রাখেন। তাই যখনই কোনো অসহায়ের জন্য তিনি সাহায্যের আবেদন করেন, মানুষ বিনা দ্বিধায় সাড়া দেয়।

"আমি গরিব, তাই গরিবের দুঃখ বুঝি"

নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে টিটু হোসেন বলেন,

"আমি গরিব, তাই গরিবের দুঃখ বুঝি। মানুষের জন্য কিছু করতে ভালো লাগে। আমার যদি সামর্থ্য হতো, তবে কাউকে আমি অসহায় অবস্থায় কষ্ট পেতে দিতাম না।"

তার কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে ফরিদগঞ্জের নারী সংগঠক এবং ফরিদগঞ্জ লেখক ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাবেয়া আক্তার বলেন,

"টিটু সবসময় মানুষের পাশে থাকে। ওর মনে কোনো লোভ নেই। আমরা যত সামাজিক কাজ করি, সবসময় সবার আগে টিটুকে কাছে পাই।"

উপসংহার

প্রকৃতপক্ষে টিটুর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন মানবিক মানুষ। তিনি প্রমাণ করেছেন, মানুষের পাশে দাঁড়াতে কোটি টাকার মালিক বা বড় পদ-পদবীর প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু একটি সুন্দর মন এবং মানুষের জন্য কিছু করার আন্তরিক ইচ্ছা।

দারিদ্র্য যে স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারে না, টিটু হোসেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ফরিদগঞ্জের মাটি এমন একজন সন্তানকে নিয়ে নিঃসন্দেহে গর্ব করতে পারে।