ডিজাইন: ইমেজ চালু
সোমবার ১৮ মে ২০২৬

দৈনিক সময়কাল

১৩৫ টাকার জমির জন্য ৬৫ বছর লড়াই, অবশেষে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে দখল হস্তান্তর


সাইফুর রহমান শামীম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:

টাকা পরিশোধের পরও ফেরত মেলেনি বন্ধক রাখা পৈত্রিক জমি। সেই অধিকার ফিরে পেতে কেটে গেছে দীর্ঘ ৬৫টি বছর। অবসান ঘটেছে তিন প্রজন্মের অপেক্ষার। অবশেষে আদালতের নির্দেশে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, লাল নিশানা গেঁড়ে এবং রাষ্ট্রীয় রীতি মেনে জমির প্রকৃত মালিকের সন্তানদের দখল বুঝিয়ে দিয়েছে প্রশাসন।

বুধবার (১৩ মে) বিকেলে কুড়িগ্রাম সদরের পৌর এলাকার চরুয়া পাড়ায় এক আবেগঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে এই জমি হস্তান্তর সম্পন্ন হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে পিতার রেখে যাওয়া পৈত্রিক সম্পত্তির দখল পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃদ্ধ আব্দুস সাত্তার ও তাঁর তিন ভাই।

ঘটনার সূত্রপাত ১৯৫০-এর দশকে: স্থানীয় ও আদালত সূত্রে জানা যায়, বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে কুড়িগ্রামের কলেজ পাড়ার বাসিন্দা মৃত আলেপ উদ্দিন তাঁর ফুফাতো ভাই পুরাতন শহরের গুয়াতি পাড়ার বাসিন্দা বছির উদ্দিনের কাছে মাত্র ১৩৫ টাকায় ৯ শতক জমি বন্ধক রেখেছিলেন। পরবর্তীতে বন্ধকী টাকা ফেরত দিলেও বছির উদ্দিন জমিটি আর বুঝিয়ে দেননি। এ নিয়ে বিরোধ চরম আকার ধারণ করলে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে জমিটি টাউন চেয়ারম্যানের (বর্তমান পৌর মেয়র) জিম্মায় চলে যায়। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান জমিটি দেখভালের জন্য স্থানীয় এক ব্যক্তির জিম্মায় দেন।

আদালতের বারান্দায় কেটে গেল তিন যুগ:   নিজের জমি ফিরে পেতে ১৯৬১ সালে তৎকালীন আদালতে মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী আলেপ উদ্দিন। কিন্তু মামলার কোনো সুরাহা হওয়ার আগেই ১৯৭২ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর চার ছেলে আব্দুস সাত্তার গং এই আইনি লড়াইয়ের হাল ধরেন। নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত, আরজি আর আপিলের চক্করে কেটে যায় দীর্ঘ ৬৫ বছর। এর মধ্যে বিবাদী বছির উদ্দিনও মারা যান, ওয়ারিশ হিসেবে মামলায় প্রতিপক্ষ হন তাঁর ছেলেরা।

আদালতের চূড়ান্ত রায় ও জিম্মা প্রত্যাহার:

সম্প্রতি কুড়িগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক আসাদুজ্জামান এক আদেশে উল্লেখ করেন, বাদী পক্ষ মৃত আলেফ উদ্দিনের পুত্র আব্দুস সাত্তারের বৈধ মালিকানা বিদ্যমান রয়েছে। অন্যদিকে বিবাদী পক্ষের জবাব দাখিলের জন্য সময়ের কোনো যৌক্তিকতা না থাকায় তা নামঞ্জুর করা হয়। একই সাথে জমিতে ইতিপূর্বে গৃহীত রিসিভার (জিম্মাদার) প্রত্যাহার করে জমি আব্দুস সাত্তারকে হস্তান্তরের জন্য সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দেওয়া হয়।

লাল পতাকা উড়িয়ে জমি দখল:

আদালতের আদেশ মোতাবেক বুধবার বিকেলে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুল ইসলাম, সরকারি সার্ভেয়ার, পুলিশ সদস্য এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে জমিটি পরিমাপ করা হয়। এরপর ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ও লাল পতাকা উড়িয়ে আলেপ উদ্দিনের ওয়ারিশ আব্দুস সাত্তার গংদের মালিকানায় দখল স্বত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়। জিম্মাদারেরা উপস্থিত থাকলেও বিবাদী পক্ষের ওয়ারিশদের কাউকেই এ সময় ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি। বিরল ও ঐতিহাসিক এই রাষ্ট্রীয় রীতি উপভোগ করতে চত্বরে উৎসুক এলাকাবাসীর ঢল নামে।

সন্তোষ প্রকাশ বাদী পক্ষের:

আদালতের নির্দেশে ৯ শতক জমির আইনি লড়াই হলেও সরেজমিনে বাদী পক্ষকে ৬ দশমিক ৬৮ শতক জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট জমিটি জনসাধারণের চলাচলের রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

দীর্ঘ লড়াই শেষে জমি বুঝে পেয়ে আবেগে আপ্লুত আব্দুস সাত্তার বলেন, “টাকা দিয়েও ফুফাতো ভাইয়ের কাছে আমার বাবা জমি ফেরত পাননি। জমি চাইতে গিয়ে আমার বাবা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমরা চার ভাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বাবার জমির দখল পেলাম। কিছুটা জমি রাস্তার জন্য ছেড়ে দিতে হলেও, সন্তান হিসেবে পিতার অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শান্তি।”

এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুল ইসলাম জানান, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে প্রকৃত মালিকের ওয়ারিশদের জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে লাল নিশানা গেঁড়ে সরকারিভাবে দখল বলবৎ করা হয়েছে