ডিজাইন: ইমেজ চালু
সোমবার ২০ এপ্রিল ২০২৬

দৈনিক সময়কাল

প্রবাসীদের দক্ষতা ও শিক্ষা ব্যবস্থা, সময়ের প্রয়োজনে আমূল সংস্কার:


প্রবাসীদের দক্ষতা ও শিক্ষা ব্যবস্থা: সময়ের প্রয়োজনে আমূল সংস্কার:

আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত পাঠ্যপুস্তক-কেন্দ্রিক ও সার্টিফিকেট অর্জনের দৌড়ে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে এই ব্যবস্থা এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবি রাখে। বিশেষ করে আমাদের দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমান। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তাদের বড় একটি অংশ বিদেশে গিয়ে কায়িক শ্রম বা 'লেবার' শ্রেণীর কাজ ছাড়া অন্য কোনো পেশায় যাওয়ার সুযোগ পান না। এর মূল কারণ—শিক্ষাজীবনে তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি ও ব্যবহারিক দক্ষতার অভাব।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই গ্লানি থেকে মুক্তি দিতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করা এবং কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

১. বিদেশি ভাষার ওপর দক্ষতা:

প্রবাসে গিয়ে ভাষাগত দুর্বলতাই একজন কর্মীর উন্নতির প্রধান অন্তরায়। ইংরেজি তো বটেই, গন্তব্য দেশের স্থানীয় ভাষা (যেমন—আরবি, মাকো, মালয়, জার্মান বা জাপানি) যদি আমাদের শিক্ষার্থীরা স্কুল পর্যায় থেকে শিখতে পারে, তবে তারা বিদেশে গিয়ে সাধারণ শ্রমিকের পরিবর্তে দক্ষ বা অর্ধ-দক্ষ কর্মী হিসেবে কাজ করতে পারবে। এটি তাদের আয়ের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

২. কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা (Technical Skill):

শুধু তাত্ত্বিক বিদ্যা দিয়ে বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয়। স্কুল-কলেজের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং, এসি রিপেয়ারিং, অটোমোবাইল মেকানিক বা ওয়েল্ডিংয়ের মতো কারিগরি কাজে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। একজন শিক্ষার্থী যদি সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ডিপ্লোমা অর্জন করতে পারে, তবে বিদেশে গিয়ে সে প্রথমেই ভালো বেতনের চাকরি পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হবে।

৩. কম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) শিক্ষা

বর্তমান যুগ প্রযুক্তির। কম্পিউটার চালনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহারের মৌলিক জ্ঞান এখন যে কোনো পেশার জন্যই অপরিহার্য। অফিসের ডাটা এন্ট্রি থেকে শুরু করে সৃজনশীল কাজ—সবক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ছোঁয়া রয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক পর্যায় থেকে কোডিং এবং এআই-এর ব্যবহারিক জ্ঞান প্রদান করলে তারা বিশ্ববাজারের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।

৪. নিজস্ব ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা:

গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে নিজেকে চেনা এবং নিজের শিকড় ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি নিজস্ব ধর্ম ও নৈতিকতা শিক্ষার প্রয়োজন অপরিসীম। এটি একজন মানুষের চরিত্র গঠনে সাহায্য করে, তাকে সৎ, ধৈর্যশীল ও বিবেকবান হিসেবে গড়ে তোলে। বিদেশের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে এবং নিজের পরিচয় ধরে রাখতে এই চারিত্রিক দৃঢ়তা একজন প্রবাসীর জন্য বড় শক্তির উৎস।

 আমাদের করণীয়:

আমাদের নীতি-নির্ধারকদের উচিত শিক্ষার কারিকুলামকে কেবল তথ্যের স্তূপ না বানিয়ে দক্ষতা অর্জনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা।

 শিক্ষায় বৈচিত্র্য:

 সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সংমিশ্রণ ঘটানো।

 প্রশিক্ষিত শিক্ষক:

নতুন বিষয়গুলো শেখানোর জন্য দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া।

 সচেতনতা বৃদ্ধি:

 অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের বোঝানো যে, কেবল সনদের পেছনে না ছুটে দক্ষতা অর্জনে জোর দেওয়া কেন জরুরি।

আমাদের শিক্ষার্থীরা মেধার দিক থেকে কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই, কেবল সুযোগ আর সঠিক গাইডলাইনের অভাব রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় এই আমূল পরিবর্তন আনলে আমাদের প্রবাসীরা আর 'লেবার' হিসেবে পরিচিত হবে না, বরং তারা হবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত 'দক্ষ মানবসম্পদ'। রেমিট্যান্স যোদ্ধারা তখন কেবল কষ্ট করে টাকা পাঠাবে না, বরং সম্মান ও মর্যাদার সাথে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হওয়া উচিত একজন মানুষকে স্বাবলম্বী করা। সেই লক্ষ্যে সময়োপযোগী পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই।