সোনারগাঁয়ের মাটিতে সাড়ে ৭০০ বছরের প্রাচীন ইসলামিক গ্রন্থাগারের ইতিহাস
এস এম মিঠু,সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি:
ইতিহাসের পাতায় সোনারগাঁ শুধু প্রাচীন বাংলার রাজধানী হিসেবেই নয়, ইসলামি জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও বিশেষ মর্যাদা বহন করে। প্রায় সাড়ে সাতশ বছর আগে এই জনপদে গড়ে উঠেছিল এমন একটি শিক্ষাকেন্দ্র, যার সঙ্গে ছিল সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগার। ঐতিহাসিক এই গ্রন্থাগারকে ঘিরে সোনারগাঁয়ের ইসলামি জ্ঞানচর্চার ইতিহাস আজও গবেষক ও ইতিহাসপ্রেমীদের আগ্রহের বিষয়।
শায়খ আবু তাওয়ামার হাত ধরে জ্ঞানচর্চার বিস্তার
ঐতিহাসিক সূত্র ও বিভিন্ন গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনে জানা যায়, ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগে ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলেম শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা (রহ.) সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে হাদিস, ফিকহ ও ইসলামি আইনশাস্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করা হতো।
শিক্ষাকেন্দ্রটির সঙ্গে ছিল একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণকর্মী ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এটিকে তৎকালীন জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দূর-দূরান্ত থেকে আসতেন শিক্ষার্থীরা
শায়খ আবু তাওয়ামার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাকেন্দ্রটি একসময় সোনারগাঁকে ইসলামি জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করে। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে, দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে জ্ঞান অর্জনের জন্য আসতেন। একসময় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছিল বলেও ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই নয়, সে সময়ের এই শিক্ষাকেন্দ্রে বিভিন্ন জ্ঞানচর্চার বিষয়ও গুরুত্ব পেত বলে কিছু ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এটি একটি বিস্তৃত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল।
ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্তেও সোনারগাঁ
সোনারগাঁয়ের এই ঐতিহাসিক শিক্ষাকেন্দ্রের গুরুত্বের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—বিশ্বখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে সোনারগাঁয়ের এই শিক্ষাকেন্দ্রের কথা উল্লেখ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, মধ্যযুগে সোনারগাঁ শুধু বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; জ্ঞান ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও এর পরিচিতি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
আজও টিকে আছে ধ্বংসাবশেষ
কালের বিবর্তনে সেই প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্র ও গ্রন্থাগারের মূল স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে। তবে মোগরাপাড়া এলাকার ষোলপাড়ায় এর কিছু ধ্বংসাবশেষ এখনো টিকে আছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫ সালে স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণকর্মীরা ওই স্থানের সংরক্ষণের দাবিতে মানববন্ধনও করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, গুরুত্বপূর্ণ এই প্রত্নসম্পদ দ্রুত সংরক্ষণ করা না হলে অবশিষ্ট নিদর্শনও হারিয়ে যেতে পারে।
ইতিহাসের সাক্ষী, সংরক্ষণের অপেক্ষায়
সোনারগাঁয়ের এই প্রাচীন গ্রন্থাগার শুধু একটি পুরোনো স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ নয়; এটি বাংলার মধ্যযুগীয় ইসলামি শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্মারক। প্রায় সাড়ে সাতশ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে নতুন প্রজন্মের কাছে সোনারগাঁয়ের জ্ঞানচর্চার অতীত আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
ইতিহাসবিদ, গবেষক ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে স্থানটি যথাযথভাবে জরিপ, সংরক্ষণ ও তথ্যফলক স্থাপনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এর ইতিহাস তুলে ধরা প্রয়োজন। তবে এসব উদ্যোগের বর্তমান সরকারি অবস্থা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সোনারগাঁয়ের মাটিতে হারিয়ে যাওয়া সেই গ্রন্থাগার তাই আজও যেন নীরবে বলে যায়—এই জনপদে একসময় জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছিল বহু দূর।