বাইডেনের যত পরিকল্পনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শপথ গ্রহণের পর পরই আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বাতিল করবেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারিকৃত অ-আমেরিকান বিধিসহ বেশ কয়টি বিধি। নির্বাহী আদেশ দেবেন ডজনখানেক। শপথ নেওয়ার পর প্রথম কর্মদিবসেই নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করবেন জো বাইডেন। অভিবাসন থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়ে গত চার বছরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অবস্থান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর আয়োজন থাকছে এসব নির্বাহী আদেশে। আসন্ন বাইডেন প্রশাসনের চিফ অব স্টাফ রন ক্লেইনের স্মারক থেকে জানা গেছে, নির্বাচনী প্রচারের সময় বাইডেন যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা রক্ষা করার প্রথম প্রমাণ শুরুর দিনেই জানান দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। মুসলিমপ্রধান বিভিন্ন দেশ থেকে আমেরিকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি প্রথম দিনই বাতিল করবেন বাইডেন। জলবায়ু-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে এনেছিলেন ট্রাম্প। বাইডেন তাঁর প্রথম কর্মদিবসেই এই চুক্তিতে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেবেন। বাইডেন প্রশাসনের প্রথম কর্মদিবসের নির্বাহী আদেশের মধ্যে আরও রয়েছে- করোনা পরিস্থিতি চলাকালীন শিক্ষা ঋণ পরিশোধ স্থগিত রাখার নির্দেশ। অর্থনৈতিক কারণে বাড়ি ভাড়া দিতে না পারার কারণে ভাড়াটেদের উচ্ছেদ স্থগিত রাখার আদেশ। বাইডেন আগেই জানিয়েছেন, তিনি তাঁর ক্ষমতার প্রথম দিনেই নির্বাহী আদেশে ফেডারেল স্থাপনায় মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করবেন। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ ছাড়াও সরকারের বিভিন্ন বিভাগের প্রতি বাইডেনের নির্দেশনামূলক কিছু আদেশ জারি করা হবে বলে জানিয়েছেন রন ক্লেইন। ক্ষমতার ১০০ দিনের মধ্যে ব্যাপক অভিবাসন সংস্কার আইন নিয়ে কাজ করার জন্য আইনপ্রণেতাদের কাছে প্রস্তাব তুলে ধরবেন বাইডেন। আমেরিকার ভেঙে পড়া অভিবাসন-ব্যবস্থাকে ট্রাম্প একের পর এক নির্বাহী আদেশ জারি করে আরও জটিল করে তুলেছেন। বাইডেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি লাখ লাখ নথিপত্রহীন অভিবাসীর জন্য আমেরিকার নাগরিকত্বের পথ উন্মুক্ত করবেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন প্রথম সপ্তাহের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় করোনা পুনরুদ্ধারে তাঁর ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবটি নিয়ে কংগ্রেসকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেবেন। বাইডেন বক্তৃতায় স্পষ্ট করেছেন, তাঁর প্রথম আইন প্রণয়নের উদ্যোগের মাধ্যমে আমেরিকার অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত নাগরিকদের সহযোগিতায় আইন পাস করা হবে। রন ক্লেইন জানিয়েছেন, সব সমস্যা কেবল নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। আইনপ্রণেতাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসব পদক্ষেপ দ্রুততার সঙ্গে গ্রহণ করা হবে। সিনেটে রিপাবলিকানদের সঙ্গে বাইডেনের সুসম্পর্ক এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে। শুরুতেই প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলো সিনেটে শুনানির মাধ্যমে নিশ্চিত করাই হবে বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসনের অন্যতম জরুরি কাজ। রন ক্লেইনের স্মারক থেকে জানা গেছে, ২৫ জানুয়ারি থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাইডেন যেসব আদেশ জারি করবেন, তার মধ্যে রয়েছে সরকারের সব পর্যায়ে আমেরিকার পণ্য ক্রয় করা। এই সময়ের মধ্যেই আমেরিকার ফৌজদারি অপরাধের বিচারব্যবস্থাকে (ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম) সংস্কার করার নির্দেশনা দেবেন বাইডেন। ক্ষমতা গ্রহণের শুরুর সপ্তাহেই আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে নথিপত্রহীন অভিবাসীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের পুনরায় একত্রীকরণ করতে ফেডারেল এজেন্সিকে নির্দেশ দেবেন বাইডেন। স্বাস্থ্যসেবা বর্ধিত করবেন। অধিক সংখ্যক লোক যাতে স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার পায়, সে জন্য নির্দেশনা জারি করবেন তিনি। রন ক্লেইন বলেছেন, এসবই বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসনের কাজের শুরু মাত্র। করোনা মোকাবিলা, অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনা, আমেরিকায় চলমান বর্ণবাদ ও অসাম্য মোকাবিলায় আরও অনেক জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হবে। চরমপন্থিদের হুমকি মোকাবিলা, জলবায়ু সমস্যাসহ অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো মাথায় রেখে কাজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রন ক্লেইন। তিনি বলেন, বাইডেনের নেতৃত্বে আমেরিকা যে আবার সঠিক পথে ফিরে এসেছে, তার প্রমাণ ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এ ছাড়া ১০ দিনের মধ্যে বাইডেন তাঁর ঘোষিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকল্পে ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের করোনা স্টিমুলাস বিল পাসের জন্য কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানাবেন। বহুল প্রত্যাশিত সোয়া কোটি কাগজপত্রহীন অভিবাসীকে নানা প্রক্রিয়ায় সিটিজেনশিপ প্রদানের একটি বিলও কংগ্রেসে উপস্থাপনের অনুরোধ জানাবেন বাইডেন। অর্থাৎ নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের প্রথম ধাপেই তিনি ‘ডাবল অভিশংসিত’ প্রেসিডেন্টের নীতি-নৈতিকতাহীন পদক্ষেপগুলো মুছে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রকে সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম শুরু করতে চান।

করোনায় পর্যুদস্ত জনজীবনে আর্থিক সংকটও চরমে, একই সঙ্গে বর্ণবিরোধী উত্তেজনাও রয়েছে, এমন অবস্থার মধ্যেই প্রেসিডেন্টের লেলিয়ে দেওয়া জঙ্গিদের সন্ত্রাসী হামলায় ক্যাপিটল হিল তথা যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র আর সংবিধান লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে সারা আমেরিকায়। এ অবস্থার অবসানে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আরও কিছু কার্যক্রম শুরু করা হবে ১০০ দিনের মধ্যেই। বিশেষ করে ১০০ দিনে ১০০ মিলিয়ন তথা ১০ কোটি আমেরিকানকে করোনার টিকা প্রদানের অঙ্গীকারও রয়েছে। বাইডেনের এসব পরিকল্পনার আলোকে গত শনিবার তাঁর মনোনীত হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ রন ক্লেইন একটি সার্কুলার বিতরণ করেছেন।

৩ নভেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর থেকে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭৫ দিনে ট্রাম্পের কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ আমেরিকানদের মতো বাইডেনও এ অরাজক-প্রশাসকের যন্ত্রণাবিদ্ধ অবস্থা থেকে জনগণকে দ্রুত নিষ্কৃতি প্রদানের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের এসব পরিকল্পনায় চলমান অস্থিরতা-উত্তেজনার মধ্যেও স্বস্তিবোধ করছেন অনেকে। কথায় কথায় টুইটার, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের মতো ‘ছেলেমি’ তিনি করবেন না বলে বাইডেনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন। রাজনীতি আর প্রশাসনিক দিকনির্দেশার প্রচলিত রীতিই অনুসরণ করতে চান জো বাইডেন।
যুক্তরাষ্ট্রে হাই অ্যালার্ট : সংবিধান অনুযায়ী ২০ জানুয়ারি বেলা ১২টায় শপথ নেবেন জো বাইডেন। সব প্রস্তুতি চলছে সারা দেশে ‘হাই অ্যালার্ট’র মধ্যেই। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি এলাকা জনমানবহীন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। সেনাবাহিনী গিজ গিজ করছে সর্বত্র। ট্রাম্পের সমর্থক তথা অভ্যন্তরীণ জঙ্গি গোষ্ঠী ৬ জানুয়ারির মতো ২০ জানুয়ারি বুধবারও শপথ গ্রহণের প্রাক্কালে সন্ত্রাসী হামলার হুমকি দিয়েছে। শুধু ক্যাপিটল হিল নয়, ৫০ স্টেটের রাজধানীতেই সশস্ত্র আক্রমণের কর্মসূচি ঘোষণায় ‘এফবিআই এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি’ সর্বত্র বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। পেনসিলভেনিয়া, মিশিগান, টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া, ম্যারিল্যান্ড, নিউ মেক্সিকো, ইউটাহ, জর্জিয়া, অ্যারিজোনা, উইসকনসিনসহ ১২ স্টেটের পার্লামেন্ট ভবন ও স্টেট গভর্নর অফিসে সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সেসব অফিসের বাইরে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তা বাহিনী অবস্থান নিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সিটি বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট অধ্যুষিত সিটি ছাড়াও রিপাবলিকান অধ্যুষিত যেসব সিটিতে ট্রাম্প ভোট পাননি, সেসবেও গোলযোগের ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে গোয়েন্দারা আশঙ্কা করছেন। অর্থাৎ ৬ জানুয়ারির হুমকিকে পাত্তা না দেওয়ার যে পরিণতি সারা জাতি অবলোকন করেছে, তার পুনরাবৃত্তিতে বিশ্বাসী নন কেউই। এসব কারণে কঠিন এক অস্থিরতা ও সন্ত্রস্ত অবস্থার মধ্যে শপথ নেবেন বাইডেন ও কমলা হ্যারিস। স্মরণকালে এমন পরিস্থিতি কখনো হয়নি। কারণ এখন পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেননি ব্যালট যুদ্ধে ধরাশায়ী ট্রাম্প। শপথ অনুষ্ঠানেও না থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি চেষ্টায় আছেন কোনো একটা পরিস্থিতি তৈরি করতে।