নমরুদের মশা , হাবিবুল্লাহ বাহার ও বর্তমান ঢাকা

আজ থেকে ২০ বছর আগে ছোট ভাই আশিকের দাওয়াতে বরিশালের বাখারগঞ্জ গিয়েছিলাম। রাস্তার পাশে ছোট একটি ছেলেকে বিড়ি খেতে দেখে কৌতুহলী হয়ে তাকিয়ে থাকলাম । ছেলেটি আমাদের তাকানো দেখে বলে উঠল ‘’ মোরে এইরহম দেহাইলে অইবেকি মোর বয়স অইছে)’’ সাথে সাথে আমার মনে পরে গেল A mother in Manville এর Dialog ’’Size doesen’t matter’’ প্রাণি জগতে মশার অবস্তান খুবই ক্ষুদ্র। এরকম একটি ক্ষুদ্র প্রাণির সাথে লড়াই করে ধ্বংস হয়েছিল নমরুদ।

আল্লাহর সাথে মোকাবেলা করা জন্য নমরুদ বারো বর্গমাইল জায়গায় সেনা ছাউনি ফেলেছিল । তার সৈন্য সংখ্যা ছিল ষাট লক্ষ। নমরুদ ঘোষণা করলো “যুদ্ধ পতাকা উড়িয়ে দাও, সতর্ক হও, নাকাড়া বাজাও।”ষাট লক্ষ [?? ] সেনার শোরগোলে ভূমি প্রকম্পিত হল। নমরুদ ইব্রাহিম আ.কে বললো, “কোথায় তোমার রবের সৈন্যদল?

মুহুর্তের মধ্যে আসমান থেকে চলে এল মশার বাহিনী । কিন্তু নমরুদ এদের ব্যক্তিত্বকে খাটো করে দেখলো। অবজ্ঞার সূরে বললো, “এ তো মশা! তুচ্ছ এক প্রাণী, তার উপর নিরস্ত্র। তোমার রবের কি অস্ত্র-ভান্ডার বা মালখানা নেই?” ইব্রাহিম আ. বললেন, “আমার রবের সেনাবাহিনী সম্পর্কে আপনার কোন ধারণাই নেই। আপনার এই সেনাবাহিনীর জন্যে তিনি এই তুচ্ছ, নিরস্ত্র মশাকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। আর নিরস্ত্র হলেও এরা তাদের যুদ্ধ কৌশল জানে। এখন আপনি শুধু এই বাহিনীর মোকাবেলা করে আপনার শক্তি, সামর্থ্য ও মেধার পরিচয় দিন।”
এদিকে এই মশা বাহিনীর সঙ্গে কিরূপে যুদ্ধ করতে হবে তা ভেবে পাচ্ছিল না নমরুদের সেনারা। এত ক্ষুদ্র প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাদের পূর্ব কোন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বা ট্রেনিং- কোনটাই নেই। সুতরাং তারা হতভম্ভ হয়ে আদেশের অপেক্ষায় সাঁরিবদ্ধ ভাবে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল।

এই অবসরে প্রতিটি সৈন্যের মাথার উপর একটি করে মশা অবস্থান নিল। অতঃপর কেউ কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই তারা তাদের নাসিকা পথে মস্তিস্কে প্রবেশ করল। তারপর দংশন। সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হল। হিতাহিত জ্ঞান শুণ্য হয়ে তীরন্দাজগণ উর্ধ্বে তীর নিক্ষেপ করতে লাগল। আর পদাতিক সেনারা নিজেদের চতুষ্পার্শ্বে অন্ধের মত তরবারী চালনা শুরু করল। এভাবে একে অপরকে নিজেদের অজান্তেই তারা আহত বা নিহত করে ফেলল।নমরুদ পালিয়ে প্রাসাদে ফিরে আসছিলো। এসময় একটি দূর্বল মশা তাকে তাড়া করল। সে কিছুক্ষণ তার শিরোস্ত্রাণের চতুষ্পার্শ্বে কয়েকবার প্রদক্ষিণ শেষে সুড়ুৎ করে তার নাসিকা পথে মস্তিস্কে ঢুকে পড়ল। তারপর ধীরে সুস্থ্যে মগজে দংশন শুরু করল। যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়লেন নমরুদ।

উন্মাদের ন্যায় প্রাসাদে প্রবেশ করলো। এক সময় দিশেহারা হয়ে পাদুকা খুলে নিজের মাথায় আঘাত করতে শুরু করলেন তিনি। এতে মশা দংশনে বিরত রইল। তিনি একটু আরাম বোধ করলেন। কিন্তু আঘাত বন্ধ করতেই মশা পুন:রায় দংশন শুরু করল। অবশেষে নমরুদ তার মাথায় মৃদু আঘাত করার জন্যে একজন সার্বক্ষণিক কর্মচারী নিযুক্ত করলো। এদিকে নমরুদের সার্বক্ষণিক দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মচারী অতিষ্ট হয়ে পড়েছিল। এক মুহুর্ত অবসর নেই। সামান্য বিরতিতেই তিরস্কার। একসময় তার মনে এমন বিরক্তি ও ক্রোধের সৃষ্টি হল যে, সে তার হস্তস্থিত পাদুকা দ্বারা সজোরে এক আঘাত হানে। ঐ আঘাতেই নমরুদের মৃত্যু হয়। সূদীর্ঘ ৪০ বৎসর তিনি ঐ দু:সহ যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন।

নমরুদের এই যুদ্ধ ও পরিণতি সম্পর্কে ইহুদি রাব্বানিক সাহিত্য (some versions) জানায়- “Nimrod thenchallenges Abraham’s God to battle. When Nimrod appears at the head of enormous armies, God produces an army of gnats which destroys Nimrod’s army.Some accounts have a gnat or mosquito enter Nimrod’s brain and drive him out of his mind.” (সূত্র: তাফসিরে ইবনে কাসির , বাইবেলের বুকস অব জেনেসিস ও বুকস অব ক্রোনিকেলস অবলম্বনে)

মশা দমনে হাবিবুল্লাহ বাহারের কার্যকরি পদক্ষেপ:

ঐতিহাসিকভাবেই ঢাকা মশার জন্য বিখ্যাত ছিল। মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মুঘলরা বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদ সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। ইংরেজ শাসনামলে ঢাকায় তাদের যে ক্যান্টনমেন্টে ছিল (পুরানা পল্টন এলাকায়; পল্টন মানে সেন ইউনিট) সেটি মূলত ব্যবহৃত হতো বেয়ারা সৈনিকদের টাইট দেওয়ার জন্য পানিশমেন্ট পোস্টিং হিসেবে। সমগ্র ভারতবর্ষে যত বেয়াড়া সৈনিক, তাদেরকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হতো, মশার কামড় খেয়ে, ম্যালেরিয়া বাঁধিয়ে তারা সোজা হয়ে যেত।

কালক্রমে ব্রিটিশরা চলে গেল, পাকিস্তান তৈরি হলো, ঢাকা হলো পূর্ব বাংলার রাজধানী। নতুন দেশের নতুন রাজধানীতে লোকজন বসতবাড়ি করতে শুরু করল, ভারত থেকে লাখে লাখে মুসলমান এসে ঢাকাতেই উঠলো। কিন্তু মশার যন্ত্রণা কমলো না।সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেলেন ফেনীর সন্তান হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী। কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সাবেক অধিনায়ক এই মানুষটি কথা কম বলতেন, কাজ বেশি করতেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০,০০০ মশার ঔষধ ছিটানোর মেশিন আনালেন ব্রাশের তৈরি এই মশার ঔষধ ছেটানোর লম্বা টিউব আকৃতির যন্ত্রগুলো (১৯৮০-৯০ সাল পর্যন্ত ঢাকা শহরে রয়েছিলো)। রাস্তার পাশে গভীর ড্রেন খনন করালেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক করলেন, শহরের সবগুলো পুকুর খাল ডোবা পরিষ্কার করালেন, ইস্পাহানীর সহায়তায় মশার ওষুধ ছিটানোর উপযোগী দুটো বিমান পর্যন্ত ক্রয় করালেন। পঞ্চাশ দশকে মাত্র দুই বছরের মধ্যে উনি ঢাকার মশাকে এমন মাইর দিলেন যে, উনার মৃত্যুর আরো ১০ বছর পর ১৯৭৫/৭৬ সালেও ঢাকা শহরের মানুষ মশারি না টানিয়ে ঘুমাতে পারতো।আফসোস! বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু হাবিবুল্লাহ বাহার এর মত আরেকজন মানুষ জন্ম নেয় নি।

বর্তমানে ঢাকার অবস্থা:

পৃথিবীতে ৩৫০০ প্রজাতির মশা আছে এর মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ মশা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। বাকি ৯৪ শতাংশ মশা খাদ্যশৃঙ্খলের জন্য খুবই উপকারী। মশার কামড়ে প্রতি বছর প্রায় ১মিলিয়ম মানুষ মারা যায় । ঢাকা শহরে ১৪.৪ মিলিয়ন মানুষ বাস করে। ঢাকায় রয়েছে ১১ প্রজাতির মশা ।

গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪০৫ জন, মারা গেছেন সাতজন। গত বছর জানুয়ারিতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৯৯ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪৫ জন, মার্চে ২৭ জন, এপ্রিলে ২৫ জন, মে মাসে ১০ জন, জুনে ২০ জন, জুলাইতে ২৩ জন, আগস্টে ৬৮ জন, সেপ্টেম্বরে ৪৭ জন, অক্টোবরে ১৬৪ জন, নভেম্বরে ৫৪৬ জন এবং ডিসেম্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ২৩১ জন।গত বছরের স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার এক জরিপেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ১২ শতাংশ এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ১০ শতাংশ এলাকায় এডিস লার্ভার ঝুঁকিপূর্ণ উপস্থিতির চিত্রও উঠে এসেছে।

এতে দেখা যায়, দক্ষিণ সিটির ৫নং ওয়ার্ডের মুগদা, ৬নং ওয়ার্র্ডের মায়াকানন, ১১নং ওয়ার্ডের শাহজাহানপুর ও ১৭নং ওয়ার্ডের কলাবাগান এলাকা এবং উত্তর সিটির ১নং ওয়ার্ডের উত্তরা ৪নং সেক্টর, ১৬নং ওয়ার্ডের কাফরুল, ২৮নং ওয়ার্ডের পশ্চিম আগারগাঁও ও ৩১নং ওয়ার্ডের নূরজাহান রোড এলাকায় এডিসের লার্ভার ঘনত্ব সূচক ইনডেক্স ২০ পয়েন্টের বেশি মিলেছে।দক্ষিণের ৩৭নং ওয়ার্ডের বাংলাবাজার এলাকায় ঘনত্ব সূচক ইনডেক্স ৭০ এবং ৪২নং ওয়ার্ডের লক্ষ্মীবাজার এলাকার ইনডেক্স ৫০ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে উত্তরের ১২নং ওয়ার্ডের তোলারবাগ এলাকায় এই সূচক ৩০ পয়েন্ট।

মশক নিধনে মাঝেমধ্যে দুই সিটি কর্পোরেশনের কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা গেলেও কার্যকরি পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। গত বছর দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছিল – ওষুধ উত্তরে দিলে মশা দক্ষিণে যায় , আর দক্ষিণে ওষুধ দিলে মশা উত্তরে যায় । তার এরকম হাস্যকর মন্তব্যে ঢাকাবাসী খুব মর্মাহত হয়েছিল।

ঢাকার দুই মেয়রের কাছে আমাদের আবেদন , এই মশা নমরুদের মতো শক্তিশালী বীরকে কুপোকাত করেছিল। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কারনে আফ্রিকার অনেক দেশ মশার কাছে অসহায় হয়ে পড়ছে। আবার হাবিবুল্লাহ বাহারের সঠিক পদক্ষেপে ঢাকা মশা মুক্ত হয়েছিল। মশা মারার ব্যাট, কয়েল সহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও কেউ বর্তমানে রেহাই পাচ্ছে না। সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করে আপনারাও ইতিহাসে হাবিবুল্লাহ বাহার হয়ে থাকুন।

ইশতিয়াক মু. আল আমিন
কার্যকরি সদস্য : সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন
Chief News Editor: shadhinanglanews.com
Email: mollikmuhammad83@gmail.com