সিজদাবনত হয়ে তওবার মাধ্যমে শুরু হোক নতুন বছর

ইশতিয়াক মু. আল-আমিন

পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর উৎসব ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’। নতুন বছরটি মানব জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত একটি বছরের পর্যালোচনা ও নতুন এক বছরের পরিকল্পনা গ্রহণ করা সচেতন বুদ্ধিমানের কাজ । অত্যন্ত দুর্ভ্যাগের বিষয় হলো আমরা এ নতুন বছরকে বরন করতে গিয়ে অধিকাংশ সময়ই বিজাতীয় সংস্কৃতি আমদানী করে থাকি। এবং এটাকে খুব গৌরব বোধ করি । জীবনে আমরা যে নতুন সময় পেয়েছি তাকে গনিমত হিসেবে মনে করতে হবে। কারণ সময়ের মূল্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে খুব বেশি । এজন্য আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে সময়ের কসম খেয়েছেন।
যেমন- আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ “শপথ ফজরের, শপথ দশ রাত্রির, শপথ তার” (সুরা ফজরঃ ১-২) আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ “শপথ রাত্রির, যখন সে আচ্ছন্ন করে” (সুরা আল লাইলঃ ১)।আল্লাহ তায়া’লা আরো বলেনঃ “কসম যুগের (সময়ের)” (সুরা আসরঃ ১)।তিনি ইঙ্গিত করেছেন যে, চন্দ্র সূর্য সৃষ্টি তার নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম যাতে মানুষ বছর ও সময়ের গণনা ও হিসেব করতে পারে।আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ “নিশ্চয় নামায মুসলমানদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে”।(সুরা নিসাঃ ১০৩) ।আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এতটা বয়স দেইনি,যাতে যা চিন্তা করার বিষয় চিন্তা করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীও আগমন করেছিল”। (সুরা ফাতিরঃ ৩৭)।ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত রাসুল সা. বলেন- ‘এমন দুটি নিয়ামত আছে যে দুটোতে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তা হচ্ছে সুস্থতা ও অবসর তথা সময়’।(বোখারি ৬৪১২, তিরমিজি ২৩০৪)। সময়কে গুরুত্ব দেবার ব্যাপারে আরেকটি হাদিসের কথা আরো রঙ্গিনময় হয়ে ফুটে উঠে। রাসুল সা. এক সাহাবীকে জীবন সম্পর্কে এভাবে উপদেশ দিয়েছেন যে, ‘পাঁচটি বিষয়কে অপর পাঁচটি বিষয়ের আগে মূল্য দাও! বার্ধক্যের আগে যৌবনকে, অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে, দারিদ্রের আগে ধণাট্যাকে, ব্যস্ততার আগে অবসরকে এবং মৃত্যুর আগে হায়াতকে (আল মুসতাদরাক ৭৮৪৬)। রাসুল সা. বলেন- ‘পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসিত না হওয়া পর্যন্ত বিচার দিবসে কোন মানুষ তার পা নাড়াতে পারবে না। ১.তার হায়াত সম্পর্কে তা কোথায় উড়িয়েছে ২. তার যৌবন সম্পর্কে তা কোথায় মলিন করেছে ৩. তার সম্পদ সম্পর্কে ক. তা কোথায় থেকে আয় করেছে খ. কোথায় খরচ করেছে ৫. সে যা জেনেছে সে অনুযায়ী কতটা আমল করেছে’। তিরমিজি ২৪১৬।
সময় হলো সোনার চেয়ে দামী। পৃথিবী শ্রেষ্ট অমূল্য সম্পদ। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সময় তার আপন গতিতে বহমান। সময়ের আছে নিজস্ব বক্তব্য ও মানবের প্রতি ভালবাসার টান। সময়ের বক্তব্য হলো- আল্লাম সুয়ূতী জামাউল জাওয়াকে রাসুলের একটি হাদিস উল্লেখ করেন। প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দিন এই বলে ঘোষণা করতে থাকে যে, ‘যদি কেউ কোন ভাল কাজ করতে চায় তাহলে যেন সে তা করে নেই। কেননা আমি কিন্তু আর ফিরে আসবো না। আমি ধনী দরিদ্র, ফকির মিসকিন, রাজা প্রজা, সকলের জন্য সমান। আমি বড় নিষ্ঠুর। আমি কারো প্রতি সদয় ব্যবহার করতে শিখেনি। তবে আমার সঙ্গে যে সদ্ব্যবহার করে সে কখনো বঞ্চিত হবে না’।
হযরত হাসান বছরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি কতিপয় দিনের সমষ্টিমাত্র। যখনই তোমার থেকে একদিন চলে যাবে তখনই তোমার কিছু অংশ চলে যাবে”। এ (কিছু অংশ) আবার ঘণ্টা, মিনিট ও সেকেন্ডে বিভক্ত। যখনই এক মিনিট বা এক সেকেন্ড চলে যাবে তখনই কিছু অংশ চলে যাবে। অতএব সময়ই জীবন।
দেশে দেশে থার্টি ফাস্ট নাইট বরণ:
একেক দেশে একেক সংস্কৃতির মাধ্যমে বর্ষবরণ অনুষ্ঠিত হয়। একজন অন্য জনের গায়ে পানি ছিটিয়ে থাইল্যান্ডের উৎসব, আঙুর খেয়ে স্পেনের উৎসব, নববর্ষের শুরুতে ঘুমালে চোখের ভ্রু সাদা হয়ে যায় সে কারণে শুরুর সময়টাতে না ঘুমানো কোরিয়ানদের উৎসব, রাত ১২টা বাজার সাথে সাথে বারোটি ঘণ্টা বাজানোর মাধ্যমে মেক্সিকোর উৎসব, ভোর হওয়ার সাথে শিক্ষকদের নিকট র্দীঘায়ু কামনা করে ভিয়েতনামের উৎসব, পরিবারের সব সদস্যদের একত্রে রাত্রে আহার করার মাধ্যমে আর্জেন্টিনা উৎসব, সাদা পোষাক পরিধান করে ব্রাজিলবাসীর উৎসব পালিত হয়। পটকা ,আতশবাজি , ডিজে পাটিং , মদ- গাজা- ফেনসিডিল সেবন সহ অনেক অশ্লীল আয়োজনের মাধ্যমে সাধারণত আমদের দেশে নতুন বছরকে বরণ করা হয়। এসব অপকর্মের কোন প্রতিবাদ করলেই তাকে রাজাকার , ধর্মান্ধ ও মৌলবাদের তকমা লাগানো হয়।
থার্টি ফাস্ট নাইট ডে’র উৎপত্তি বা যেভাবে এল থার্টি ফাস্ট
ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে জুলিয়াস সিজার সর্বপ্রথম ইংরেজি নববর্ষ উৎসবের প্রচলন করেন। ১ জানুয়ারি পাকাপোক্তভাবে নববর্ষের দিন হিসেবে নির্দিষ্ট হয় ১৫৮২ সালে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের পর। ধীরে ধীরে শুধু ইউরোপে নয় সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ পালন করা হয়। সাধারণভাবে প্রাচীন পারস্যের পরাক্রমশালী সম্রাট জমশীদ খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালে নওরোজের প্রবর্তন করেছিলেন। ধীরে ধীরে শুধু ইউরোপে নয় সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ পালিত হচ্ছে। সময়ের পরিক্রমায় এটি ইরান হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশ এবং ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করে।
থার্টি ফাস্ট নাইটে যে সকল কাজ নিষিদ্ধ:
✪ ১. অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা:
এ রাত্রিকে কেন্দ্র করে চলে অশালীন ও বেহায়াপনার মহোৎসব। যুবতীরা আঁটসাঁট, অশালীন ও অর্ধ নগ্ন পোশাক পরিধান করে অবাধে চলাফেরা করে। অথচ এ প্রসঙ্গে নবী (সা:) বলেন,“ঐসব নারী যারা হবে পেষাক পরিহিতা কিন্তু প্রায় নগ্ন। যারা পরপুরুষকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও আকৃষ্ট হবে। তাদের মাথা বক্র উঁচু কাঁধ বিশিষ্ট উটের ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এমনকি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না।” (সহীহ মুসলিম: ২১২৮)
✪ ২. শিরক যুক্ত শ্লোগান:
মুসলিমদের অনেকেই বর্ষবরণ করতে দিয়ে শিরকের মধ্যে লিপ্ত হয়ে ইমান হারা হচ্ছে। আর তাদের শ্লোগান হচ্ছে-
“মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা
অগ্নি স্নানে সূচি হোক ধরা।”
উক্ত শ্লোগানে অগ্নিপূজকদের আগুন দ্বারা পবিত্র হওয়ার ভ্রান্ত বিশ্বাস সু-স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে। অথচ অগ্নিকে সম্মান করা, আগুনের কাছে সাহায্য চাওয়া এবং আগুন দ্বারা পবিত্র হওয়ার ধারণা করা শিরক। আর আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,“নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা তার সাথে শিরুক কারীকে ক্ষমা করবেন না।” (সূরা নিসাঃ ১১৬)
✪ ৩. বিজাতীয় সাদৃশ্য:
থাটি ফার্স্ট নাইট উদযাপন সম্পূর্ণরূপে বিজাতীয় সংস্কৃতি। এ রাত্রিতে আতশবাজি, পটকাবাজি, ফ্যাশন শো, ফায়ার প্লে, ট্যাটো বা উল্কা অংকন, ডিজে পাটি ও কনসার্ট, নেশা সেবনসহ বিজাতীয় সংস্কৃতির সাথে সাদৃশ্য রাখে। ইসলাম এটি কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।রাসূল (স.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনাে সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করলো সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (আহমদ, আবু দাউদ, মিশকাতঃ ৪৩৪৭)
■ যুব সমাজকে ধ্বংস ও নারীদের সম্ভ্রম নষ্ট করার নীল নকশা:
যুব সমাজকে ধ্বংস ও নারীদের সম্ভ্রম নষ্ট করার জন্যই থাটি ফার্স্ট নাইট বাংলাদেশে আমদানি করা হয়েছে। ২০০০ সালের ৩১ শে ২৫ মিনিটে গুলশানে থাটি ফাস্ট নাইট উদযাপনকারী এক তরুণীকে কিছু মাতাল যুবক শ্লীলতা হানি করে ও তার শরীরের বেশীর ভাগ কাপড় ছিঁড়ে ফেলে। (সূত্র- দৈনিক মানবজমিন, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০০০ইং)আর ২০০১ সালের শাওন আখতার বাধনের ক্ষত-বিক্ষত দেহ কে না দেখেছেন? আরও কত বাধন! এ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় থাটি ফাস্ট নাইটে আনন্দের নামে কী হচ্ছে? ২০০০ সাল থেকে আজ ২০ বছর যাবত বেহায়াপানার গতি ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে এটি আধুনিকতা নাম ধারন করছে । প্রগতিশীল নামের বুদ্ধিজীবীরাও এ অপসংস্কৃতি আমদানিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে।
অথচ, আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:“আর তোমরা জেনার নিকটবর্তী হয়ো না।” (সূরা বনী-ইসরাইল: ৩২)“মহান আল্লাহ যাবতীয় অশ্লীল অন্যায় কাজ হারাম করেছেন।” (সূরা আল আ’রাফ: ৩২)
পরিশেষে সকলকে উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি যে, জেনা, মদ্যপান ও অমুসলিমদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণের এই নিকৃষ্ট সংস্কৃতিকে চিরদিনের জন্য বাংলাদেশ থেকে বিলীন করতে আমরা সচেষ্ট হই। এ লক্ষ্যে সকল মুসলিমকে সীসা ঢালা প্রাচীরের মত প্রতিরোধ বুহ্য সৃষ্টি করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা ও অন্যদেরকে এই বিষয়ে সচেতন করার মাধ্যমে জান্নাত লাভ করার জন্য আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আল্লাহ্‌ তা’য়ালা বলেন,“তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে ও পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।” (সূরা আত-তাহরীম: ৬)
লেখক: chief News editor: shadhinangla news.com
Executive member: SAARC HUMAN RIGHTS FOUNDATION