সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকার পাহাড়

কালো টাকা সাদা করতে প্রতি বছর নানা সুযোগ দিলেও দেশে বিনিয়োগ না হয়ে অধিকাংশ কালো টাকাই পাচার হয়ে যাচ্ছে। কোনোভাবেই তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আর এসব কালো টাকার পাহাড় জমছে সুইজারল্যাণ্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকে। সেখানে বাড়ছে বাংলাদেশিদের আমানত। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে জমার পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায়, যা ১৩০ কোটি টাকা কম। যদিও কালো টাকার বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থানে ভারত-পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী সব দেশ থেকেই আমানত অনেক কমেছে সুইজারল্যান্ডে।

বৃহস্পতিবার ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড-২০১৮’ বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সুইজারল্যান্ড্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ন্যাশনাল সুইস ব্যাংক (এনএসবি)। সেখান থেকে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার এ তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯’র ডিসেম্বরে, সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের আমানত দাঁড়িয়েছে ৬০ কোটি ৩০ লাখ সুইস ফ্রাঁ; দেশি মুদ্রায় ৫ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা। ঠিক এক বছর আগে, এ অঙ্ক ছিলো ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাঁ বা ৫ হাজার ৫৫৩ কোটি। আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশিদের আমানত মাত্র ১৩০ কোটি টাকা কমলেও, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব দেশের আমানত কমেছে আরো অনেক বেশি পরিমাণে। পাঁচ বছরে, ভারতীয়দের আমানত কমেছে অর্ধেক। মাত্র দু’বছরে পাকিস্তানিদের আমানত কমেছে এক-তৃতীয়াংশ।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, নির্বাচনের বছরে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে যায়।’

তিনি বলেন, সাধারণত পণ্য আমদানির মাধ্যমেই অর্থাৎ ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইন ভয়েসিংয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থ পাচার হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে কালো টাকা পাচার নিয়ন্ত্রণে অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপগুলো আরো জোরদার করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ভারতের মতো বাংলাদেশ সরকারকেও সুইস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এগুলো যে অবৈধ অর্থ সেটা প্রমাণ করে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। যদি অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা করা যায় তবে ভবিষ্যতে দেশের বাইরে টাকা পাঠানোর প্রবণতা কমে যাবে।

জানা গেছে, সুনির্দিষ্ট গ্রাহকের তথ্য না দিলেও, কয়েক বছর ধরে দেশভিত্তিক আমানতের পরিমাণ প্রকাশ করছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিবেদনে দেখা যায়, সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী, কোনো বাংলাদেশি, নাগরিকত্ব গোপন রেখে অর্থ জমা রেখে থাকলে, ওই টাকা এ হিসাবে অন্তর্ভূক্ত নয়। গচ্ছিত রাখা স্বর্ণ বা মুল্যবান সামগ্রীর আর্থিক মূল্যমানও হিসাব করা হয়নি এই প্রতিবেদনে।

ধনীদের অর্থ, গোপনে গচ্ছিত রাখার জন্য বহুযুগের খ্যাতি সুইজারল্যান্ডের। প্রায় দু’শো বছর ধরে, ব্যাংকিং সেবার কেন্দ্র ইউরোপের দেশটি। ৮০ লাখ মানুষের দেশে, ব্যাংকের সংখ্যা ২৪৬টি। গ্রাহকের নাম-পরিচয় গোপন রাখতে কঠোর তারা। ধারণা করা হয়, অবৈধ আয় ও কর ফাঁকি দিয়ে জমানো টাকা রাখা হয় সুইস ব্যাংকে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে অর্থ জমার পরিমাণ সামান্য কমলেও ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকের জমার পরিমাণ আরো অনেক বেশি পরিমাণে কমেছে। সুইস ব্যাংকে ভারতীয়দের অর্থ জমার পরিমাণ কমার কারণ হিসেবে জানা গেছে, ভারত সরকারের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের এ-সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। ভারত সরকার সে দেশের অনেক অর্থ পাচারকারীর তথ্য সাম্প্রতিক সময়ে সুইজারল্যান্ড থেকে সংগ্রহ করেছে। তবে বাংলাদেশের বেলায় তেমনি ঘটেনি।