Breaking News

পলাশীর ট্রাজেডি : নবাবের পতন ও আমাদের শিক্ষা

ইশতিয়াক মু. আল-আমিন

আজ থেকে ২৬৩ বছর আগে বাংলা বিহার উড়িস্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন হয়েছিল । মূলত নবাবের পতন হয়নি বরং পতন হয়েছে বিশ্বাসঘাতকদের । নবাব সিরাজউদ্দৌলা দেখিয়ে গিয়েছেন কীভাবে দেশের জন্য জীবন বিলিয়ে দিতে হয় । ব্যক্তির জীবনের চেয়ে দেশ এবং জনগন একজন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে অনেক বড়। সাথে সাথে ষড়যন্ত্রকারীরা নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো-দেশ এবং জাতিকে রক্ষার জন্য যে সিরাজ জীবন বিলিয়ে দিলেন আজ তার নামটাও জাতির সন্তানেরা ভুলে যেতে বসেছে। পাক ভারত উপমহাদেশে রাজনৈতিক ভাবে ইংরেজ শাসন চূড়ান্ত ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় পলাশী যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। যে গোষ্ঠি এসেছিল এ দেশে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে, তারা হত্যা করল নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে, প্রতিষ্ঠিত করল ভারতের বুকে ইংরেজ শাসন। পলাশীর যুদ্ধের পরাজয়ের অনেক গুলি কারণ ছিল , কিছু ছিল প্রত্যক্ষ কারণ আবার কিছু ছিল পরোক্ষ।

বাংলায় ইংরেজদের বাণিজ্যের অনুমতি:

মোঘল সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় ছেলে শাহ সুজা (১৬৩৯-১৬৬০) বাংলার সুবাদার ছিলেন। ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে শাহ সুজা মাত্র তিন হাজার টাকা বাৎসরিক করের মাধ্যমে ইংরেজদের বাংলার সর্বত্র বাণিজ্য করার অধিকার দিয়েছিলেন। শাহ সুজার দেয়া এই বিশাল প্রাপ্তিতে ইংরেজরা শুধু রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছই হয়নি। কূটকৌশলী এবং স্বার্থান্বেষী ইংরেজ বাণিজ্যের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্য কুঠির পাশাপাশি সেখানে গোপনে দুর্গ নির্মাণ ও অস্ত্রশস্ত্রের মজুদও আরম্ভ করেছিল। ইংরেজদের এসব কার্যকলাপের খবর দিল্লীর সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে পৌঁছলে তার নির্দেশে ইংরেজদের সুযোগ-সুবিধা অনেকাংশে রহিত করা হয়। একদিকে আওরঙ্গজেবের সুযোগ-সুবিধা রহিত করণ ও অন্যদিকে সুবেদার শায়েস্তা খাঁনের ইংরেজদের অনিয়ম বন্ধে কঠিন পদক্ষেপের কারণে তারা দীর্ঘ ৬৫ টি বছর চুপচাপ ছিল।

অসুস্থ ফখরুর শিয়ার ও ইংরেজ ডাক্তর :

১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজদের বাণিজ্যের দুয়ার ফের খুলে যায়। ঘটনাটি ছিল এরকম, দিল্লীর সম্রাট ফররুখশিয়র ‘হ্যামিল্টন’ নামক এক ইংরেজ চিকিৎসকের চিকিৎসায় যারপরনাই সন্তুষ্ট হয়ে ইংরেজ চিকিৎসককে পুরস্কৃত করতে চেয়েছিলেন। সুচতুর ধুরন্ধর ইংরেজ হ্যামিল্টন নিজের আর্থিক সুবিধার কথা না ভেবে স্বজাতির বাণিজ্যের জন্যে বিশেষ সুবিধা প্রার্থনা করেছিলেন। চিকিৎসকের অনুরোধই বহাল হলো। ডাক্তারের প্রতি দুর্বল হয়ে , দেশ ও জাতির স্বার্থের কথা চিন্তা না করে কোম্পানীর স্বর্থের অনুকূলে তিনি ফরমান জারি করেন

মোঘল সম্রাজ্যের ১০ম সম্রাট ফখরুরুখ শিয়ার । সম্রাট তখন ফররুখশিয়র, আওরঙ্গজেবের নাতি। কোম্পানির লোকজন তাদের ব্যবসায়িক কিছু দাবি-দাওয়া নিয়ে ফখরুর শিয়ারের সাথে দেখা করতে গেল দিল্লীতে। কিন্তু গিয়া তারা শোনল ফররুখশিয়রের বিয়া। তিনি রাজপুত এক রাজার মেয়েরে বিয়া করতেছেন। বিয়া না হওয়া পর্যন্ত আলাপ হবে না। ইংরাজরা বিয়ার অপেক্ষায় বইসা রইল ।এরপরে হঠাৎ ফররুখশিয়র অসুস্থ হইয়া পড়লেন। ডাক্তার, বদ্যি, হাকিম, কবিরাজ কেউ তার রোগ ভালো করতে পারে না। অতঃপর খোঁজ পড়ল ইংরাজদের দলে থাকা ডাক্তার হ্যামিল্টনের। হ্যামিল্টন সাহেব গিয়া রোগী দেখলেন। এবং সম্রাট ফররুখশিয়র, হ্যামিল্টন সাহেবের ওষুধে ভালো হইয়া উঠলেন । খুশি হইয়া সম্রাট ফররুখশিয়র ইংরাজদের কলকাতার কাছে চব্বিশটা গ্রামের জমিদারী উপহার দিয়া দিলেন। এইটাই হইল চব্বিশ পরগনা । ঘটনা এখানেই শেষ নয় । তারা সম্রাটের কাছ থেকে তাদের অনুকূলে একটি ফরমান জারি করাইল । যে ফরমানই শেষ পর্যন্ত পালাশীর ট্রাজেডির নায়কের ভূমিকা পালন কর।

ফখররুখ শিয়ারের ফরমান

১৭১৭ সালে ইংরেজদের অনুকূলে জারি করা ফররুখ শিয়ারের ফরমান

১.ইংরেজ কোম্পানির প্রতিনি ধি কর্তৃক জল বা স্থলে বহণকৃত সকল মালামাল ও জরুরি দ্রব্যদি বার্ষিক ৩০০০ রূপি পেশকাসের বিনিময়ে শুল্কমুক্ত হবে।
২. যদি কোম্পানির মালামাল লুন্ঠিতহয় তবে হারিয়ে যাওয়া সকল মাল উদ্ধারের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে।
৩.কোম্পানি যে কোনো জায়গায় বাণিজ্য কুটি স্থাপনের উদ্যোগ নিলে তাদের যথাযথ সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।
৪.কোম্পাণির ফ্যাক্টর বা এজেন্টদের কাছে স্থানীয় বনিক বা তাঁতি ঋণগ্রস্ত হলে ধার্যকৃত অর্থ পরিষোধ করতে হবে।
৫.কোম্পানীর নিজস্ব জাহাজ বা ভাড়া করা জাহাজ নিরাপদে চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।
৬.কোম্পানি কতৃক ক্রয়ক্রত গ্রামগুলির মালিক কোম্পানিই থাকবে।এতে কোনো হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
৭.মাদ্রাজ টাকশাল থেকে জারিকৃত রৌপ্যমুদ্রার মান যদি সুরাট বন্দরে জারিকৃত মুদ্রার সমমানের হয় তাহলে কোন কমিশন দাবি করা যাবে না।
৮.যদি কখনও কোম্পানির কোন কর্মচারী ঋণগ্রস্ত হয়ে পালিয়ে যেতে চায় , তাহলে তাকে কুটির প্রধানের কাছে সোপর্দ করতে হবে । (দায়মুক্তি)
৯. জাহাজডুবিতে কোম্পনির মালামাল খোয়া গেলে সেই মালামালের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে।

নবাবের সিংহাসন আরহণ :

১৭৫৬ সালের ১৫ এপ্রিল নবাব সিরাজউদ্দৌলা বাংলার মসনদে আসীন হন এবং তার পূর্ণ নাম ও পদবি হয় নবাব মনসুর-উল-মুলক মির্জা মোহাম্মদ শাহ কুলী খান সিরাজউদ্দৌলা হজরত জঙ বাহাদুর। সিংহাসনে আরোহণ করেই সিরাজ বুঝতে পারেন, বাইরের শত্রুর আগে তাকে ঘরের শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। এদের মধ্যে ছিলেন খালা ঘসেটি বেগম, খালা মোমেনা বেগমের ছেলে পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা শওকত জঙ ও আলীবর্দী খাঁর বৈমাত্রেয় বোনের স্বামী মীর জাফর আলী

পারিবারিক দ্বন্দের কারণ:
অপুত্রক আলীবর্দী খানের দুই জামাতার মধ্যে একজন ছিলেন ঢাকার শাসনকর্তা, তারা আশা করেছিলেন আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পরে তারা মসনদের উত্তরাধিকারী হবেন। কিন্তু সিরাজকে উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নেয়ার তাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এবং তা অবশেষে শতরুয়ায় পরিণত হয়। নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান শত্রু ছিল তাঁর খালাত ভাই পূর্ণিয়ার নবাব শওকত জঙ্গ। সিরাজউদ্দৌলার অপর শত্রু ছিল তাঁর খালা ঢাকার ভূতপূর্ব শাসনকর্তার বিধবা পতত্মীক মেহেরুন নেসা। মেহেরুন নেসা ওরফে ঘসেটি বেগম ছিলেন অপুত্রক। তিনি সিরাজ উদ্দৌলার ছোট ভাই ইকরামুদ্দৌলাকে লালন পালন করেন। ঘসেটি বেগমের ইচ্ছা ছিল নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পরে ইকরামুদ্দৌলাকে মসনদে বসাবেন। কিন্তু ইকরামুদ্দৌলা অকালে মৃত্যু বরণ করেন। ঘসেটি বেগম শওকত জঙ্গের প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে পড়েন। এক সময় ঘসেটি বেগম শওকত জঙ্গকে সিরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

মীর জাফর নবাব সিরাজ উদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি হয়ে নবাব সিরাজের প্রধান শত্রু হয়ে ওঠেন। ঘসেটি বেগম ও শওকত জঙ্গের সাথে যখন নবা সিরাজ উদ্দৌলা ব্যতিব্যস্ত তখন মীর জাফর ইংরেজ কোম্পানীর সাথে সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। নবাব সিরাজউদ্দৌলা খালা ঘসেটি বেগমকে তার প্রাসাদ থেকে নিজ প্রাসাদ মনসুর গঞ্জে নিয়ে আসেন। এসময় সিরাজ মীর জাফরকে প্রধান সেনাপতি থেকে সরিয়ে মীর মদনকে ঐ পদে নিয়োাগ প্রদান করেন। পরে তিনি অবশ্য মীর জাফরকে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব প্রদান করেন। কিন্তু মীর জাফর মনে মনে নবাবের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। মীর জাফরকে পূঃণরায় প্রদান সেনাপতির দায়িত্ব দেয়াটা সিরাজের চরম ভুল ছিল।
নবাব যদি তথন মীরজাফরকে হত্যা করে ফেলতেন তাহলে কিচ্ছা একেবারে খতম হয়ে যেত। এখানে পারিবারিক অনুরোধের কারণে নবাবকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

নবাব পরিবারের বাহিরের শত্রু:

নবাবি পরিবার সদস্যদের বাহিরে রাজা রায় দূর্লভ, মহাতাব চাঁদ জগৎশেঠ, এয়ার লুৎফে খাঁ প্রমুখ স্বার্থপর ও অসৎ ব্যক্তিবর্গ মীর জাফর-জগৎশেটের

নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলা ও বাংলার নবাবের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ষড়যন্ত্র করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে যোগাযোগ ও আঁতাত করেন, তাকে জানিয়ে দেন তারা নতুন নবাব দেখতে চান। এই চক্রের পছন্দের প্রার্থী হলেন বেঈমান সিপাহসালার মীর জাফর আলী খাঁন।বাংলার নবীন নবাব সিরাজুদ্দৌলা ছিলেন প্রিয় দাদু মরহুম নবাব আলীবর্দীর আদলে-আদর্শে গড়া-স্বাধীন চেতা-বৃটিশ বিদ্বেষী-স্বাধীন শাসক। বাংলার নবাবির দায়িত্বভার তিনি ইরেজদের ঔদ্ধত্য খর্ব করার জন্য কোলকাতা অভিযান করেন। বিজয় অর্জন করে প্রিয় দাদুর নামে কোলকাতা নতুন নামাকরণ করেন আলীনগর। শাসক হিসেবে নবাব সিরাজুদ্দৌলা যখন কৃতিত্ব ও পারদর্শিতা প্রদর্শন করছিলেন তখন মীরজাফর-জগৎশেট-চক্র সিদ্ধান্ত নিলেন নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে আর সময় দেয়া যায় না, চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ারএখনইসময়।বাংলাদেশ আর্কাইভসের সহকারি পরিচালক-লেখক ফজলে আহমদ চৌধুরীর গবেষণা গ্রন্থ-“দলিলপত্রে পলাশীর যুদ্ধ”-তে বলা হয়েছে, মীর জাফর আলী খান ও ইংরেজদের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্রে-
‘আমি আল্লাহ্ ও আল্লাহর নবীর নামে শপথ করছি যে, যতক্ষণ পর্যন্ত জীবন আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এই সন্ধির শর্তাবলী মেনে চলব লেখা ছিল। (অর্থাৎ নবাবের পতন না হওয়া পর্যন্ত ইংরেজদের সর্বোপরি সহযোগিতা করব।)

প্রশাসনে হিন্দুদের আধিক্য:

মুর্শিদ কুলি খাঁ যখন নবাব হিসেবে মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত সে সময় থেকেই তার প্রশাসনে হিন্দু আমলাদের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। মোগল আমলে বহু জায়গীর ও জমিদারী মুসলমানদের করায়ত্ত ছিল। বড় বড় জায়গীরদার ও জমিদারদের অধিকাংশ মুসলমান ছিলেন। কয়েকজন মুসলমান জমিদার রাজস্ব আদায় করতে অসমর্থ হওয়ায় তিনি তাদের জমিদারী

কেড়ে নেন এবং হিন্দুদের বন্দোবস্ত দেন। এরূপ মাহমুদপুর (নদীয়া-যশোহর) ও জালালপুর পরগনার কয়েকটি মুসলমান জমিদারী রামজীবনকে দেয়া হয়। সোনারগাঁওয়ের ঈসা খাঁনের বংশধরদেরও কয়েকটি পরগনা হারাতে হয়। মুর্শিদ কুলি খাঁন তাদের জমিদারী আলাপশাহী ও মোমেনশাহী পরগনাদ্বয় কেড়ে নেন এবং দুজন রাজস্ব কর্মচারীকে উক্ত জমিদারী বন্দোবস্ত দেন। সিরাজউদ্দৌলা মানিক চাঁদ ও নন্দকুমারকে যথাক্রমে কলকাতা ও হুগলির ফৌজদার পদে নিয়োগ করেন। প্রশাসনে হিন্দু আমলাদের প্রাধান্য কালক্রমে নবাবকে এক ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সে ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল থেকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা বের হতে পারেননি। এই হিন্দুরাই নবাবের পতনকে পরোক্ষভাবে তরান্বিত করে ।

কৃষ্ণদাষ কাহিনী:

তিপ্পান্ন লাখ রুপির রাষ্ট্রীয় তহবিল আত্মসাত্ করে কলকাতায় ইংরেজদের কাছে পালিয়ে যায় কৃষ্ণদাস । তাকে ফেরৎ দেওয়ার জন্য নবাব ইংরেজদের চাপ দিলে তারা কোন কর্ণপাতই করেনি। পালিয়ে যাওয়া কৃষ্ণদাসকে ফেরত দিতে তারা অস্বীকৃতি জানান।

ব্যাংকার জগৎশেঠ

জগৎশেঠ বাংলার ইতিহাসে এক খলনায়ক। যুবক নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে বিপাকে ও বিপদে ফেলার জন্য জগৎশেঠ বাংলা ও বাঙালীর ইতিহাসে এক কলঙ্কিত খলনায়ক হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আছে। ধনাঢ্য ব্যক্তি ও নবাবদের ব্যাংকার জগৎশেঠ তার অর্থের মায়াজালে শুধু মুর্শিদাবাদের নবাবদেরই গ্রাস করেননি ইংরেজদের কাছেও জগৎশেঠ প্রিয়পাত্র ছিলেন। সে সময় শুধু নবাবদের লেনদেনের কাজ করেই জগৎশেঠ বছরে ৪০ লাখ টাকা মুনাফা করতেন।

যুদ্ধের দামামা!

আর দশটা স্বাভাবিক দিনের মতোই সেদিন সূর্য উঠেছিল মুর্শিদাবাদের আকাশে। কিন্তু সে আকাশ মেঘলা হয়ে যায় দুপুর নাগাদ। সেইসাথে বাংলা অঞ্চলের স্বাধীনতার আকাশেও দেখা দেয় দুর্যোগের ঘনঘটা।সমকালীন ইতিহাসের নানা সূত্রে জানা যায়, ১৭৫৭ সালের জুন মাসের শুরুর দিকে লর্ড ক্লাইভের বাহিনী কলকাতা থেকে রওয়ানা হয়ে জুনের ১৭ তারিখে দক্ষিণে কাটোয়া দুর্গ অধিকার করে। ষড়যন্ত্রকারীরা এমনই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল যে, কলকাতা থেকে কাটোয়ার মধ্যবর্তী স্থানে নবাবের বেশ কিছু সেনা ছাউনি থাকলেও কেউ বাধা দিতে এগিয়ে আসেনি। ২১ জুন ক্লাইভ তার বাহিনী নিয়ে পলাশীর দিকে যাত্রা করে এবং পথিমধ্যে মীর জাফরের কাছ থেকে আসে প্রতীক্ষিত সবুজ বার্তা। একথা সবারই জানা, নবাব সিরাজকে সরাতে হয়েছিল একটি ঘৃণিত ও কলঙ্কজনক প্রাসাদ ষড়যন্ত্র
পলাশীর যুদ্ধ:
ফিরে আসা যাক পলাশীর প্রান্তরে। ক্লাইভের নেতৃত্বে ইংরেজ বাহিনী হুগলি নদী পার হয়ে ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে শিবির স্থাপন করে। পলাশীর আম্রকাননে সুবিধাজনক অবস্থানে শিবির স্থাপন করে ইংরেজ বাহিনী। সেখানে আগে থেকেই ছিল নবাব সিরাজের একটি সুরক্ষিত শিকার বাড়ি। লক্ষবাগ নামের আমবাগানের চারপাশে মাটির বাঁধ ইংরেজ বাহিনীকে দিয়েছিল বাড়তি সুবিধা। পলাশী যুদ্ধে নবাবের পক্ষে ছিল ৫০,০০০ সৈন্যের বিশাল বাহিনী। আর ইংরেজ পক্ষে ছিল মাত্র হাজার তিনেক সৈন্য। অস্ত্র, গোলাবারুদ, হাতি, ঘোড়া কোনোদিক থেকেই পিছিয়ে ছিল না নবাবের বাহিনী। কিন্তু এর মধ্যে ৪০,০০০ সৈন্যই ছিল মীর জাফর সহ বিশ্বাসঘাতক সেনানায়ক রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফদের অধীনে। আর যুদ্ধক্ষেত্রে তারা নিয়েছিল নীরব ভূমিকা। পলাশী সমরক্ষেত্রের নদী তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থান নিয়েছিলেন মীর মদন। তার একপাশে ছিল ফরাসি সেনানায়ক মঁসিয়ে সিনফ্রে ও অপর পার্শ্বে সেনাপতি মোহনলাল। সবমিলিয়ে তাদের অধীনে ছিল মাত্র হাজার দশেকেরও কম সৈন্য। সে যুদ্ধে মীর মদন ও মোহনলাল ছাড়া আর যে কয়েকজন নবাব কিংবা নিজ দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, তারা হচ্ছেন- বন্দুক বাহিনীর কমান্ডার বাহাদুর আলি খান, গোলন্দাজ বাহিনীর অধিনায়ক নয়ে সিং হাজারি প্রমুখ। যুদ্ধের শুরুতেই মীর মদন ইংরেজ বাহিনীকে কোণঠাসা করে ফেলেন। তবে ইংরেজরা এতটা প্রতিরোধ আশা করেনি। ক্লাইভ বিচলিত হয়ে মীর জাফরকে জিজ্ঞেস করেন, কেন এমন প্রতিরোধ হচ্ছে? মীর জাফর তাকে উত্তর পাঠান, তাদের বাহিনী কোনো যুদ্ধ করছে না, যারা লড়ছে তারা মীর মদন আর মোহনলালের বাহিনী। শুধু তাদের পরাস্ত করতে পারলেই হবে। যুদ্ধ চলতে থাকে। দুপুর নাগাদ আকাশে জমে মেঘ। শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। ধুরন্ধর ইংরেজ বাহিনী নিজেদের কামান আর গোলাবারুদ তারপুলিন দিয়ে ঢেকে ফেললেও নিজেদের কামান আর গোলাবারুদ ঢাকতে ব্যর্থ হয় নবাবের বাহিনী। যার ফলে বৃষ্টিতে ভিজে অকার্যকর হয়ে যায় নবাব বাহিনীর গোলাবারুদ। অপরদিকে সম্পূর্ণ সক্রিয় থাকে ইংরেজদের কামান। বৃষ্টিতে আকস্মিক বিপর্যয়ের পরেও মীরমদন তার প্রতিরোধ চালিয়ে যান। তার সাথে প্রাণপণে লড়ে যান মোহনলাল, খাজা আব্দুল হাদী খান, নয়ে সিং হাজারী ও ফরাসি
সেনানায়ক সিনফ্রে প্রমুখের অধীন সৈনিকরা। মীর মদন ভেবেছিলেন, ইংরেজদের গোলাবারুদও হয়তো ভিজে গেছে তাদের মতো। তাই বেশ কিছু এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। যুদ্ধের এ পর্যায়ে কোণঠাসাও করে ফেলেন ইংরেজ বাহিনীকে। এমন কোণঠাসা অবস্থায় ক্লাইভ চিন্তা করেছিলেন, দিনটা কোনোমতে টিকে থেকে রাতের আঁধারে আক্রমণ করবেন কিংবা কলকাতা পালিয়ে যাবেন। যুদ্ধের যখন এই অবস্থা, সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি ঘটে তখন। বেলা তিনটার দিকে দুর্ভাগ্যজনকভাবে হঠাৎ ইংরেজদের একটি কামানের গোলা এসে আঘাত করে মীর মদনের বুকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তাকে নবাবের তাঁবুতে নিয়ে আসা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি বিদায় নেন পৃথিবী থেকে। মীর মদনের মৃত্যু নবাবকে হতভম্ব করে দেয়। তবে মীর মদনের মৃত্যুর পরেও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখেন মোহনলাল। কিন্তু মুষড়ে পড়েন নবাব। তিনি ডেকে পাঠান মীর জাফরকে। মীর জাফর নবাবকে প্রলুব্ধ করেন যুদ্ধ বন্ধ রাখতে। অপরদিকে রায়দুর্লভ নবাব সিরাজকে প্ররোচিত করেন মুর্শিদাবাদ ফিরে যেতে। অতঃপর মোহনলালকে নবাব নির্দেশ পাঠান, যুদ্ধ বন্ধ করে শিবিরে ফিরে আসতে। তিনি না ফিরলে বারংবার তাকে শিবিরে যুদ্ধ থামিয়ে ফিরে আসতে বলা হয়। মোহনলাল এ পর্যায়ে ক্ষোভে, অভিমানে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করেন। নবাব সিরাজ নিজেও পরাজয় মাথায় করে ফিরে যান মুর্শিদাবাদের দিকে।এ পর্যায়ে বিক্ষিপ্ত, নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে যুদ্ধরত বাহিনী। ঠিক এই মুহূর্তে ক্লাইভ আক্রমণ করে বসলেন নবাবের বিক্ষিপ্ত বাহিনীকে। নেতৃত্বহীন অবস্থায় নবাবের সৈনিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লেন। তবে ফরাসি সেনানায়ক সিনফ্রে যুদ্ধ চালিয়ে যান আরো কিছুক্ষণ। তিনি মীরজাফরের কথায়ও কান দেননি কিংবা নবাবের কথাও শোনেননি। কিন্তু শেষ অবধি টিকতে না পেরে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করেন তিনিও। মুহূর্তের ব্যবধানে পরিবর্তিত হয়ে যায় যুদ্ধের গতি। সন্ধ্যার দিকেই বিজয়ী ক্লাইভ বীরদর্পে যাত্রা করলেন মুর্শিদাবাদের দিকে। বাংলার আকাশ ছেয়ে যায় অমানিশায়। বৃথা যায় মীর মদনের আত্মত্যাগ।

সিরাজুদ্দৌলার জীবনদান ও দেনা পাওনা :

স্যার যদুনাথ সরকার বলেছেন-thus ended muslim rule in bengal, the foreign master of the sward had became its king maker|
পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়, পতন ও শাহদাত বরণে বাংলার প্রশাসন ও জনজীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। মীর জাফর আলী খান নতুন নবাব হয়ে কোম্পানির সঙ্গে ভাগ বাটোয়ারা ও লুণ্ঠনে মেতে উঠেন। ফলে ১৭৬৯-৭০ সালে-ছিয়াত্তরের মনন্থর নামেভয়াবহ দুর্ভিক্ষে বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যান। ইংরেজরা অতঃপর মারাঠা, ফরাসী ও মহীশুরের বীর টিপু সুলতানকে পরাজিত ও নিহত করে ভারতব্যাপী রাজ্য বিস্তার করতে থাকে। পলাশীর একশত বছর পর ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবে বৃটিশের বিজয়, দিল্লীর শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহের প্রহসনমূলক বিচার দেশান্তর এবং মৃত্যুর পর ভারতে মুঘল শাহীর অবসান হয়।ভারতব্যাপী ইংরেজ রাজত্ব জাকিয়ে বসে। পলাশীর বিয়োগান্তক ট্রেজেডির মহানায়ক বাংলার জাতীয় বীর শহীদ সিরাজুদ্দৌলার কোরবানী বিফলে যায়নি-৪৭ সালে বৃটিশ বিতাড়িত হয়ে উপমহাদেশ পাক-ভারত নামে দুটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা লাভ করে। পাকিস্তানের পঁচিশ বৎসর পর একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অভ্যুদয় হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পরিশোধ বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব, পলাশীর মহানায়ক, জাতীয় বীর শহীদ সিরাজুদ্দৌলার উজ্জ্বল স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

নবাবের পতন থেকে আমাদের শিক্ষা :

এনজিওদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি

ইংরেজরা ব্যবসার নামে ভারতে এসে দেশ দখল করে তাদের প্রভুত্ব কায়েম করেছিল। সভ্যতা ,কৃষ্টি-কালচার ও ধর্মের বারোটা বাজিয়েছিল। তারা আবার এনজির নাম ধারণ করে এদেশে এসেছে। উদ্দ্যেশ্য বিশেষ খারাপ । তাদের কুদৃষ্টি থেকে দেশকে হেফাজত করার জন্য দরকার একদল সিরাজুদ্দৗলার যোগ্য উত্তরসূরী । আমাদের পার্বত্য এলাকাকে তারা স্বাধীন করতে বিশেষ তৎপর । সরকার এবং জাতি সতর্ক না হলে সেটা হবে ভবিষ্যৎ ইজরাইল। বিশ্বের সকল দেশে এনজিওদের কাজ করতে হলে ঐদেশেরে প্রতিনিধি সাথে থাকতে হবে। বাংলাদেশে তার সম্পূর্ণ ব্যাতিক্রম । এনজিওদের নিয়ে যদি সরকার এখনই না চিন্তুা ভাবনা করে তাহলে এর খেসারত জাতিকে শত শত বছর দিতে হতে পারে। তারা এভাবে পূর্বতিমুরকে দক্ষিণ সুদান থেকে আলাদ করে ছাড়ছে।

দেশের স্বার্থ বিরোধী চুক্তি করা যাবেনা :

এদেশটা কারো বাপ-দাদার না । যে সরকাই ক্ষমতায় থাক কোন দেশের সাথে গোপন চুক্তি করা যাবে না । ফখরুর শিয়ার এক চুক্তিতে জাতি দুইশ বছর গোলামী খাটছে। । ইংরেজদের তাড়াতে দিয়ে মানুষের লাশ শিয়াল কুত্তায় খাইছে । কত অঘটন যে বাংলায় ঘটছে! সরকার থেকে বলা হচ্ছে ‘‘ভারতে যা দিয়েছ তা সারাজীবন মনে করবে’’প্রশ্ন হলো কী মনে করবে? কী দেওয়া হয়েছে তা জাতিকে জানানো দরকার ।

প্রশাসনে সংখ্যালঘুদের আধিপত্য বিস্তার রোধ করতে হবে:

বাংলাদেশ একটি উদার গণতান্ত্রিক মুসলিম দেশ। নিসন্দেহে ভারতের চেয়েও হিন্দুরা বাংলাদেশে অনেরক সুরক্ষিত। ভারতে নিম্নবর্নের হিন্দুরা দাসদের চেয়েও জঘন্য অবস্থায় জীবনযাপন করছে। বাংলাদেশে হিন্দু সহ সব শ্রেণির সংখ্যালঘুরা তাদের অধিকার নিয়ে বসবাস করছে। একটি মুসলিম প্রধান দেশে রাষ্ট্রের একান্ত গোপনীয় স্থানে তাদের নিয়োগ না দেওয়াটাই ভালা। পশ্চিম বঙ্গে শতকার ১৭ ভাগ মুসলিম কিন্তু সরকারি চাকরিতে তাদের অবস্থা কী? ঐতিহাসিকদের মতে নবাবের প্রশাসনে হিন্দুদের আধিক্যই নবাবকে শেষ করছে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে এদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
টাকা পাচার কারীদের বয়কট করতে হবে:

সব সরকারের আমলেই দেখা গেছে তাদের এমপি মন্ত্রীদের সন্তানেরা উইরোপ আমেরিকায়া সেকেন্ড হোম গড়ে তুলছে। গত ১০ বছরে ৪০০০ লোক শুধু মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম বানিয়েছে। তাদের টাকার উৎস কোথায়?যাদের যে দায়িত্ব দেওয়া হয় তারা অধিকাংশই সে খাতকে ধ্বসংস করে ফেলে । বিভিন্ন খাতের দুর্নিনীর টাকায় কাদের ছেলেরা আমেরিকায় শিল্পকারখানা গড়ছে তা কি এদেশবাসীর অজানা ? সুতরাং এরা জাতীয় শত্রু এদের বয়কট করতে হবে।

নেমক হারামদের উপযুক্ত শাস্তি:

ঐতিহাসিকদের মতে নবাবের অন্যতম ভুল ছিল নেমকহামাদের শাস্তি না দেওয়া । এদেশে রাজার হালে থেকে প্রিয়া সাহা কীভাবে ট্রাম্পের কাছে দেশ বিরোধী নালিশ করার সাহস পায়? শ্যামলি পরিবহণের মালিক কীভাবে ভারতের পূজার অনুষ্ঠানে বলে ‘‘ আমি প্রতিদিন অপেক্ষা করি বাংলাদেশ কবে ভারতের প্রদেশে পরিণত হবে?’’ এগুলো কি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দেখে না? এদের অচিরেই আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।

লেখক:

শিক্ষক ও মানবাধিকার কর্মী